নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট
ঢাকা: মাদক মামলায় কারাগারে থাকা মাদক কারবারি, বাহক ও মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশের কয়েকটি কারাগারকে বিশেষায়িত মাদক কারাগার হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কারাগারে মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আসক্তির মাত্রা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং মোটিভেশনাল সেশনের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে কারামুক্তির পর বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ৯৩ হাজার ৪৪০ জন বন্দি ছিলেন। এর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলায় শনাক্ত বন্দির সংখ্যা ১৭ হাজার ৮১৯ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ২২৬ এবং নারী ৫৯৩ জন। বিপুলসংখ্যক মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দির জন্য বর্তমানে কারাগারগুলোতে পৃথক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা সীমিত। বিশেষায়িত চিকিৎসক ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কারিগরি সহায়তায় মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ফেনী জেলা কারাগার-২ ও কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ ইতোমধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১, মাদারীপুর জেলা কারাগার-২ এবং পিরোজপুর জেলা কারাগার-২-এও এ ধরনের কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারকেও মাদক অপরাধে জড়িত বন্দিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের শুধু কারাগারে আটক রেখে শাস্তি দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কারামুক্তির পর যাতে তারা পুনরায় মাদক বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িয়ে না পড়েন, সে জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির শুরুতে বন্দিদের শারীরিক পরীক্ষা ও প্রাথমিক স্ক্রিনিং করা হবে। আসক্তির মাত্রা নির্ধারণের পর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হবে। ডিএনসির চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের কারিগরি পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কারাগারে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
চিকিৎসার পাশাপাশি বন্দিদের মানসিক পরিবর্তনে ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং, মোটিভেশনাল সেশন এবং মনোবিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারাগারের ভেতরে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে আইসিটি, হস্তশিল্প, টেইলারিং, গ্রাফিক্সসহ বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দেওয়ার মাধ্যমে কারামুক্ত বন্দিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ থাকবে।
এ ছাড়া বন্দিদের অপরাধের ধরন, আসক্তির মাত্রা এবং চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কারা অধিদপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কারা কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু কারাভোগের মাধ্যমে মাদকাসক্ত বন্দিদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষায়িত চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া গেলে তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে কারামুক্তির পর পুনরায় মাদক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
কারা অধিদপ্তরের কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, মাদক অপরাধে জড়িত বন্দিদের কারাগারে আটকে রাখার পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা ও মানসিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় চিকিৎসা, ব্যক্তিগত ও দলীয় কাউন্সেলিং, মোটিভেশনাল কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাদক-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জনবল, বিশেষায়িত চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষণ অবকাঠামো নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Posted ৫:০৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
Desh Arthonity | Touch Tuhin
Lk Cyber It Bd