নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং চিকিৎসার নামে রোগীদের জীবন বিপন্ন করার এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি হাসপাতালটিতে চিকিৎসকদের চরম গাফিলতি, সেন্ট্রাল এসি বন্ধ থাকা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে একই দিনে ছয়টি নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার বিবরণ দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। একইসঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে সমস্ত নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে কীভাবে বাণিজ্যিক বেকারি কারখানা ও বিপজ্জনক প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ গড়ে তোলা হয়েছে, তা সংসদের সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রী। চিকিৎসা সেবার আড়ালে হাসপাতালের ভেতরে গড়ে ওঠা এমন বাণিজ্যিক মানসিকতাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা খাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অবহেলা সরকার বরদাস্ত করবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত মে মাসে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চরম অবহেলা এবং অসতর্কতার কারণে ছয়টি মায়ের বুক খালি হয়েছে। হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যখন শিশুগুলোর হাত-পা কাঁপছিল, তখন সেখানে এসি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কোনো সচল জানালা ছিল না এবং ছিল না কোনো জরুরি অক্সিজেন সাপোর্ট। ১৬ থেকে ১৭ জন মা যখন তাদের সন্তানদের বাঁচানোর জন্য চত্বরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটাছুটি করছিলেন, তখন সেখানে কোনো অন-ডিউটি ডাক্তার পাওয়া যায়নি, এমনকি নার্সরাও ডাকলে সাড়া দেননি। কার্বন ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়ায় ছটফট করতে করতে নিরীহ শিশুগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ঘটনার পর দিনই নিজে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এই গুরুতর অবহেলার প্রমাণ পেয়েছেন বলে সংসদকে অবহিত করেন মন্ত্রী।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এমন নির্মম ঘটনার পরও হাসপাতালের মালিক পক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো বা সান্ত্বনা দেওয়ার ন্যূনতম নৈতিক সৌজন্যতা দেখাননি।
হাসপাতালের ভেতরের মূল অব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক শয়তানির চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আদ্-দ্বীনের বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষা এতটাই অনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, ডাক্তার ও রোগী অবস্থান করছেন, সেখানে তারা হাসপাতালের ভেতরেই একটি বেকারি কারখানা গড়ে তুলেছে। এই বেকারি কারখানার ময়লা, স্তূপীকৃত প্লাস্টিক বর্জ্য এবং আশপাশের জমা জলবদ্ধতার কারণে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে, যা থেকে নির্গত গ্যাস ও দূষণ শিশুদের মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে যেভাবে দাহ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় একটি ছোট আগুন লাগলে সেখানে থাকা কোনো রোগী কিংবা তাদের অভিভাবক প্রাণ নিয়ে বের হতে পারবেন না। এই চরম অব্যবস্থাপনা ও লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে সরকারি তদারকিতে নতুন চিফ এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এই কঠোর আইনি পদক্ষেপকে দলীয়করণ বা মাথা কেটে ফেলার সঙ্গে তুলনা না করার জন্য বিরোধী বেঞ্চের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কারও দলীয় আদর্শ দিয়ে দেশের ক্ষতি বা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা সমর্থন করা যায় না। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে কঠোর শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
সংসদে বিরোধী দলের এক সদস্যের বক্তব্যের জেরে পবিত্র কোরআনের সূরা নজমের আয়াত উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আল্লাহর রাসুল যা বলেন তা ওহীর ভিত্তিতেই বলেন, নিজের থেকে বলেন না। কিন্তু রাজনীতিতে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে, এমন কথা যারা ছড়ান, তারা চরম শিরক করছেন এবং এজন্য তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
বাজেটের রাজস্ব আদায় নিয়ে বিরোধীদের সংশয়ের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী জীবন ছেড়ে ঢাকায় পা রেখেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জন্য তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এই বাজেটের মূল চালিকাশক্তিই হলো প্রধানমন্ত্রীর সেই অর্থনৈতিক দর্শন, যা বোঝার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা সবার নেই। অতীতের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে যখন প্রথম ভ্যাট (মূসক) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তখনো এই সংসদেই তুফান তোলা হয়েছিল যে মানুষের পকেট কাটা হবে। আজ ভ্যাট ছাড়া অর্থনীতির চাকা চলে না, তেমনি আজকের রেভিনিউ বাজেটের অন্তর্নিহিত মূল্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই ভালো বোঝেন।
এই বাজেটের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষায় এই বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড এবং স্বাস্থ্য সেবার নিশ্চিতে হেলথ কার্ডের মতো যুগান্তকারী উদ্ভাবন নিয়ে আসা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্প স্থাপনে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সব অনুমোদন পেয়ে যাবেন।
এছাড়াও ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ পদ্ধতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ সব ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা প্রস্তুত পাবেন, শুধু যাবেন আর শিল্প উৎপাদন শুরু করবেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্যারিস কনফারেন্সে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ অর্থাৎ প্রতি শিশুর জন্য একটি করে চারা গাছ লাগানোর চমৎকার পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ মানুষের পকেটের চিকিৎসা খরচ (আউট অফ পকেট এক্সপেন্সেস) কমাতে এবারের বাজেটে ওষুধের ৫২টি কাঁচামাল বা অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই), ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হয়েছে।
ডেফিসিট বা ঘাটতি বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থনীতিবিদদের সূত্র টেনে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের কোনো দেশই ঘাটতি বাজেট ছাড়া উন্নয়ন বাজেট প্রণয়ন করতে পারে না, কারণ এটিই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
Posted ৫:২২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
Desh Arthonity | Rina Sristy
Lk Cyber It Bd