নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট
সাড়ে পাঁচ বিঘা জমির হাড়িভাঙা আমের বাগানে পাকা আম ঝরে পড়ছে। কিন্তু ক্রেতা নেই।
স্থানীয় আড়তেও মিলছে না আশানুরূপ দাম। ৪৮ কেজিতে এক মণ ধরে বিক্রি, পরিবহন ও শ্রম খরচ মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি ফেরত নিয়েও শঙ্কায় পড়েছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া গ্রামের চাষি শফিকুল ইসলাম। শুধু তিনি নন, ভরা মৌসুমে একই সংকটে উপজেলার অধিকাংশ আমচাষি।
আম চাষি আব্দুল ওয়াহাব জানান, পাঁচ বিঘায় ভালো ফলন হলেও তিন লাখ টাকার বাগান বিক্রি করতে হয়েছে দেড় লাখ টাকায়। পরিচর্যাতেই ব্যয় হয়েছে এক লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘জমি লিজ দিলেও যে টাকা পাওয়া যায়, আম চাষ করে এখন তার চেয়েও কম আয় হচ্ছে।’
নাটোরের সবচেয়ে বড় আহমেদপুর আমবাজার ঘুরে দেখা গেছে, হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকা, আম্রপালি এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা এবং হাড়িভাঙা এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ বেশি হলেও বাজারে চাহিদা নেই।
ব্যবসায়ী হাসেম আলী বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বাগান করেছি। ১০ মন আম্রপালি এনেছিলাম আড়তে বিক্রি করতে। শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ টাকা মণে আম বিক্রি করেছি। ২ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারলে টাকা উঠে আসত। এখন লাভ দূরের কথা আসল টাকাই উঠবে না।
আড়তদার মোশারফ হোসেন মিঠু বলেন, ‘রাত পর্যন্ত আড়তের সামনে প্রায় ৫০০ মণ আম অবিক্রি পড়ে থাকে। গত বছর একই সময়ে প্রতিদিন এক হাজার মণ আম বিক্রি হতো। বাজার পরিস্থিতি এমন থাকলে মূলধনই উঠে আসবে না।’
তবে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে লালপুরে আমবাগানের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। ২০২২ ও ২০২৩ সালে উপজেলায় ১ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে আমের বাগান ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮১০ হেক্টরে। চলতি ২০২৬ মৌসুমে বাগানের পরিমাণ আবার কমে ১ হাজার ৮০৫ হেক্টরে নেমেছে। গত বছর ২২ হাজার ৯২৩ টন আম উৎপাদন হলেও চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৬৬০ টন। সরকারি হিসাবে এক বছরে বাগান কমেছে মাত্র পাঁচ হেক্টর বা প্রায় ৩৭ বিঘা। তবে স্থানীয় চাষিদের দাবি, টানা লোকসানের কারণে শুধু এ বছরই ১০০ বিঘার বেশি আমবাগান কেটে ফেলা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত জরিপ ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে আগের তথ্যের ভিত্তিতে উৎপাদন ও বাগানের হিসাব নির্ধারণ করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। ভবিষ্যতে সংরক্ষণাগার নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে এবং কৃষকদের প্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ভরা মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় আমের দাম কমেছে। তবে আমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ‘পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর দুর্বলতাকে দায়ী করেন। তাঁর ভাষায়, সঠিক সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নাটোরে ১০টি ব্যাচে ১৫০ জন কৃষককে আধুনিক পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি কৃষকদের কাঁচা আম বিক্রির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অনলাইনে বিপণনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেশি তাপমাত্রার কারণে এ বছর একসঙ্গে বেশি আম পেকেছে। একই সঙ্গে একজাতের আমের আধিক্য ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, নিরাপদ উৎপাদন, আধুনিক সংরক্ষণ ও রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের লোকসান অনেকটাই কমানো সম্ভব।
Posted ১২:৩৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
Desh Arthonity | Touch Tuhin
Lk Cyber It Bd