বুধবার ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বীমা খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেও এনআরবি লাইফের আশ্রয়ে জসিম!

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ | প্রিন্ট

বীমা খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেও এনআরবি লাইফের আশ্রয়ে জসিম!
image_pdfimage_print

দেশের বীমা খাতে একের পর এক অনিয়ম, প্রতারণা ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে আবারও নতুন ঠিকানায় আশ্রয় নিয়েছেন বহুল আলোচিত কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন। যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে কোটি টাকার এফডিআর জালিয়াতির অভিযোগে মামলা, তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ এবং গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকার পরও বর্তমানে তিনি বহাল তবিয়তে কাজ করছেন এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) হিসেবে।

বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—একাধিক প্রতারণা, মামলা ও তদন্তে নাম আসার পরও কীভাবে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলো? তবে কি নতুন করে আরেকটি কেলেঙ্কারির মঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছে?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রায় ৯৩ জন গ্রাহকের কাছ থেকে এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করার প্রলোভন দেখিয়ে দুই কোটি ৩৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেই অর্থ গোপনে দীর্ঘমেয়াদি জীবন বীমা পলিসিতে রূপান্তর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রতারণা চক্রের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন তৎকালীন অ্যাডিশনাল এমডি মো. জসিম উদ্দিন।

গ্রাহকদের বলা হয়েছিল—প্রতি লাখে মাসিক এক হাজার টাকা মুনাফা ও বছর শেষে অতিরিক্ত ইনসেনটিভ দেওয়া হবে। অথচ বাস্তবে তাদের নামে ১২, ১৫ ও ২১ বছর মেয়াদি বীমা পলিসি খুলে কমিশনের নামে লুটে নেওয়া হয় কোটি কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, মাত্র ৫ শতাংশ কমিশনের এফডিআরের পরিবর্তে প্রতারণার মাধ্যমে সিঙ্গেল প্রিমিয়াম বীমায় রূপান্তর করে প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন ভাগিয়ে নেয় চক্রটি। শুধু এই একটি কেলেঙ্কারি থেকেই কমিশনের নামে আত্মসাৎ করা হয় এক কোটি আট লাখ ৩২ হাজার ১৭৫ টাকা।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তদন্ত প্রতিবেদনে জসিম উদ্দিনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন সিইও কামরুল হাসান খন্দকারের নির্দেশনায় জসিম উদ্দিন ও এসএএমডি রবিউল ইসলামের তদারকিতে প্রতারণামূলক এফডিআর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে জাল মেডিকেল সনদ ব্যবহার করে গ্রাহকদের নামে পলিসি ইস্যু করা হয়।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক চট্টগ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করলে সেই মামলার দ্বিতীয় আসামি করা হয় জসিম উদ্দিনকে। অভিযোগ রয়েছে, মামলার পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। অথচ এখন আবারও নতুন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছেন নির্বিঘ্নে। কিন্তু সি.আর মামলা নং-৫৬৬/২০২২ (বায়েজিদ বোস্তামী থানা)-এই মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে। ঐ মামলার আসামী হিসেবে এখনো জসিম উদ্দিন রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, জসিম উদ্দিন শুধু যমুনা লাইফেই নন, তার আগের কর্মস্থল রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রূপালী লাইফের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সেখানে তার কর্মকাণ্ড তদন্ত করা হলে “বীমা খাত কাঁপানো ভয়ংকর তথ্য” বেরিয়ে আসবে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতারণা ও আত্মসাতের অর্থে রাজধানীর খিলগাঁও ও গোরান এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন জসিম উদ্দিন। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লাতেও রয়েছে নামে-বেনামে বিপুল জমিজমা। বীমা খাতের একজন কর্মকর্তার পক্ষে এত অল্প সময়ে এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। রূপালী লাইফে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে নিজেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস উল্লেখ করলেও এনআরবি ইসলামিক লাইফে তিনি নিজেকে স্নাতক দাবি করেছেন। দুই প্রতিষ্ঠানে দেওয়া তথ্যের এই অসঙ্গতি নতুন করে জাল সনদ ব্যবহারের সন্দেহ তৈরি করেছে।

বীমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “বীমা একটি আস্থাভিত্তিক খাত। এখানে প্রতারক ও জালিয়াতদের পুনর্বাসন করা হলে সাধারণ মানুষের শেষ সম্বলও নিরাপদ থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রতারণার প্রমাণ রয়েছে, তাদের আবার দায়িত্বশীল পদে বসানো মানে গ্রাহকদের নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।”

এদিকে জসিম উদ্দিনকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এনআরবি ইসলামিক লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ্ জামাল হাওলাদার বলেন, যমুনা লাইফের এফডিআর কেলেঙ্কারির বিষয়ে তারা অবগত আছেন এবং আইডিআরএ থেকেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনই জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে আইডিআরএ, দুদক, এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় বীমা খাতের আড়ালে সংঘবদ্ধ প্রতারণা, গ্রাহকের অর্থ লুটপাট এবং দুর্নীতির এই সংস্কৃতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জসিম উদ্দিন বলেন, যমুনা লাইফের এই মামলার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আর শিক্ষাগত যোগ্যতার ধোয়াশার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার যা যোগ্যতা তাই প্রকাশ করেছি। আর সম্পদের ব্যপারে নিজ নামে শুধু ফ্লাট আর প্লটের কথাই স্বীকার করেছে জসিম উদ্দিন।

Facebook Comments Box
advertisement

Posted ২:৪৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

Desh Arthonity |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

ক্যালেন্ডার

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  
প্রধান সম্পাদক
তুহিন ভূঁইয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
আজাদুর রহমান
Contact

সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

Phone: 01718-742422, 01911-539414

E-mail: desharthonity@gmail.com

Lk Cyber It Bd