নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ | প্রিন্ট
পৃথক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন না নিয়েই প্রায় ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক বীমা কোম্পানি মেটলাইফ। ১৯৩৮ সালের আইনে ১৯৭৪ সালের ২৫ মার্চ যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে বীমা ব্যবসা পরিচালনার জন্য তৎকালীন কন্ট্রোলার অব ইন্স্যুরেন্সের কাছ থেকে বাংলাদেশে শাখা অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমোদন নেয় কোম্পানিটি। তবে পাঁচ দশকে নানামুখী উন্নয়নের ছোঁয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে বীমার বাজার ঘুরে দাঁড়ালেও মেটলাইফ চলছে সেই আগের আইনেই। ‘শাখা অফিস’ হিসেবে নিবন্ধন নেয়ার সুযোগে দেশের বিদ্যমান বীমা আইনের অনেক কিছুই মানছে না কোম্পানিটি। এখনো কোম্পানিটির শতভাগ মালিকানা রয়ে গেছে বিদেশিদের হাতে। তাদের লভ্যাংশ বাবদ প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার চলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি বাংলাদেশে ব্যবসারত বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনুমোদন প্রয়োজন হলেও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহীর নিয়োগ হয় বিদেশ থেকেই। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কার্যালয়ের খরচ বাবদ।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির শর্তও মানছে না বীমা খাতের লাভজনক এই কোম্পানিটি। বীমা আইন ২০১০ এর ২১ ধারা এবং বীমাকারীর মূলধন ও শেয়ার ধারণ বিধিমালা, ২০১৬ এর বিধান মোতাবেক বীমা কোম্পানি নিবন্ধনের তিন বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা আছে, যা পূরণ না করলে প্রতিদিনের জন্য জরিমানা গুনতে হয় বীমা কোম্পানিকে। তবে এখন পর্যন্ত এসবের ঊর্ধ্বেই থেকে গেছে মেটলাইফ বাংলাদেশ।
নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগে জীবন বীমা ব্যবসা করার জন্য বিদেশিদের হাতে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকতে পারে। বাকি ৪০ শতাংশ শেয়ার দেশিয় উদ্যোক্তাদের কাছে ছেড়ে দিতে হয়। তবে মেটলাইফের শতভাগ মালিকানা রয়েছে বিদেশিদের হাতেই। বাংলাদেশে পৃথক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন না নেয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মূল কোম্পানি মেটলাইফের (মেট্রোপলিটন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি) শাখা হওয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির শর্তও উপেক্ষা করছে মেটলাইফ।
এদিকে মেটলাইফের মালিকানার শতভাগ বিদেশিদের হাতে থাকায় মুনাফার অংশ হিসেবে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় আইডিআরএ’র কাছে মেটলাইফ ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ এই চার বছরে মালিকদের লভ্যাংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজার এক কোটি ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৭৩২ টাকা নিয়ে যাওয়ার আবেদন করে। পরবর্তীতে ওই অর্থ থেকে ৮১৮ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর অনুমতি পায় মেটলাইফ। ২০২০, ২০২১, ২০২২ সালের লভ্যাংশ বাবদও ৯৩৬ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আবেদন করেছে কোম্পানিটি।
মালিকদের লভ্যাংশের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কার্যালয়ের খরচ বাবদও অর্থ পাঠায় মেটলাইফ। ২০১৫ সালে প্রধান কার্যালয়ের খরচ ৬৮ কোটি ৪২ লাখ এবং লভ্যাংশ বাবদ ৩৮ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে মেটলাইফ। চার বছরের মাথায় ২০১৯ সালে তা বেড়ে প্রধান কার্যালয়ের খরচ হয়েছে ১০৪ কোটি এবং লভ্যাংশ হয়েছে ২৮০ কোটি টাকা। আইডিআরএ’র তথ্য বলছে, ২০২২ সালের আগে গড়ে প্রতিবছর প্রধান কার্যালয়ের খরচ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেত অন্তত ১০০ কোটি টাকা করে। তবে বাংলাদেশে ব্যবসা করে লাভ করলেও এখানে বড় কোনো বিনিয়োগ করছে না কোম্পানিটি। যদিও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী, পণ্য বা সেবা উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির শাখা অফিসের অনুমতি পাওয়ার ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় কোম্পানির মালিকানা বাংলাদেশিদের হাতে আসছে না।
জানা গেছে, মেটলাইফকে দেশিয় আইন ও নীতিমালার মধ্যে আনতে ২০১৩ সালে উদ্যোগ নিয়েছিল আইডিআরএ। ওই সময়ে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়। পৃথক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন নেওয়া, পরিশোধিত মূলধনের শর্ত পূরণ ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে কোম্পানিটির দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। কিন্তু তাতে সুরাহা হয়নি। কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধ্য করতে আইডিআরএ ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে এখনও আইনি কাঠামোর বাইরেই রয়ে গেছে মেটলাইফ বাংলাদেশ।
২০১৩ সালে আইডিআরএ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মেটলাইফ ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কার্যত কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই বাংলাদেশ থেকে অন্তত পাঁচশ কোটি টাকা (পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার ডলার) মুনাফা নিয়ে গেছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশে শুধুই তাদের পণ্য বিপণন করছে। বীমাখাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। অথচ কোটি কোটি ডলার মুনাফা অর্জন করে নিয়ে যাচ্ছে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথা সময়ে বীমা দাবি পরিশোধের পরিচ্ছন্ন ইমেজকে পুঁজি করে; দেশিয় বীমা এজেন্টদের কমিশন দেয়ার পর লভ্যাংশের নামে মোটা অংকের টাকা চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত মেটলাইফের প্রধান কার্যালয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নাকের ডগা দিয়ে; মোটা অংক বিদেশে পাঠালেও রহস্যজনক কারণে কারোরই এ ব্যাপারে কোন মাথা ব্যাথা নেই।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট উইংয়ের মহাপরিচালক আরিফুল হক ব্যাংক বীমা অর্থনীতিকে বলেন, মেটলাইফ যেহেতু স্বাধীনতার আগে আমাদের দেশে ব্যবসা শুরু করেছে; তখন বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড ছিল; যদিও এখন সবাই বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীন; তবে মেটলাইফ যেহেতু বীমা কোম্পানি এটি আইডিআরএ’র নিয়ন্ত্রণে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে কোন বিদেশি কেম্পানি ব্যবসা করতে চাইলে-বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে বিনিয়োগ নিবন্ধন নিতে হবে। বৈদেশিক লেনদেনের জন্য ওই নিবন্ধন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এনবিআর থেকে টিন এবং বিন সার্টিফিকেট নিতে হবে। চতুর্থ ধাপে যৌথ মুল্ধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয়ে নাম নিবন্ধন করতে হবে। এরপর সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়াও বিদেশি কোম্পানি হলেও নিয়ম অনুযায়ী অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী কোম্পানির অফিস সমূহকে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের অধীনে দেশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/ বিভাগ/ সংস্থা/দপ্তর/কর্তৃপক্ষের নিকট হতে লাইসেন্স নিতে হবে।
এ ব্যাপারে আইডিআরএর পরিচালক আহম্মদ এহসানুল হান্নান জানান, ১৯৭৪ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন কন্ট্রোলার অব ইন্স্যুরেন্স এম এ রহিম; ১৯৩৮ সালের বীমা আইনের ৩ ধারায় আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ( আলিকো) বাংলাদেশে জীবন বীমা ব্যবসা করার জন্য অনুমোদন দেয়।
প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন আর আগের মত চাইলেই কেউ বিদেশে টাকা নিতে পারবে না সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মেটলাইফের ২০২০, ২০২১, ২০২২ সালের লভ্যাংশের প্রায় ৯শ ৩৬ কোটি টাকা আমেরিকা পাঠানোর অনুমোদন দেয়নি আডিআরএ। তিনি বলেন আইডিআরএর হিসাব মতে, আইনানুসারে এ সমুদয় টাকার ৯০ভাগ এদেশের গ্রাহকদের টাকা। তবে ১০ ভাগ টাকা তারা পাঠাতে পারবে। এতদিন আইডিআরএর কৌশলগত ত্রুটির কারণে যা ঘটেছে; এখন থেকে আমরা চেষ্টা করবো আর যেন সেই ভুল না হয়।
মেটলাইফের লভ্যাংশ পাঠানোর আবেদন অনুমোদন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক ড.মো. আশরাফুজ্জামান ব্যাংক বীমা অর্থনীতিকে বলেন, বীমা আইন ২০১০ এর ৮২ ধারা অনুযায়ী লভ্যাংশের ১০ভাগের বেশি তারা পাঠাতে পারবে না। এই ১০ ভাগ টাকা নিতে হলেও কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন হবে।
টাকা আটকে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে মেটলাইফের ডিএমডি এন্ড চিফ ইনফরমেশন অফিসার ওয়াসি নোমান জানান, এ ব্যপারে আমি কিছু বলতে পারবো না। তবে আপনি আমাদের কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে ফোন করলে জানতে পারবেন। জানতে চাইলে মেটলাইফের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব কমিউনিকেশন সাইফুর রহমান বলেন, আমরা আবেদন করেছি আইডিআরএ সেই আবেদনের রিভিউ দিয়েছে। লাইসেন্স এবং শাখা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সাইফুর বলেন, আমাদের লাইসেন্স আছে তবে এটি আপনাকে আইডিআরএ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। আমরা আপনাকে দিতে পারবো না।
এদিকে আইনের ধারা-১৪ অনুযায়ী বীমাকারীর শাখা কার্যালয় স্থাপনের জন্য লাইসেন্স ফি বিধিমালা ২০১২ এবং বীমাকারীর শাখা কার্যালয় স্থাপন বিধিমালা-২০১২ ও কর্তৃপক্ষের চেকলিস্ট অনুযায়ী আবেদন করতে হবে। আইডিআরএ’র অনুমতি সাপেক্ষে দেশিয় কোম্পানিগুলো শাখা অফিস স্থাপন করে থাকে। এক্ষেত্রে নন-লাইফ বীমার শাখা খোলার জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং লাইফ বীমার জন্য ১০ হাজার টাকা জেলা শহরের জন্য পাঁচ হাজার টাকার বিধান রয়েছে। আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, মেটলাইফ কেবল একটি শাখার জন্য ফি প্রদান করে বাকী ২৩০ টি শাখার জন্য কোন ফি তারা দেয়নি। এ বিষয়ে সাইফুর রহমান বলেন, আমরা মেটলাইফ আমেরিকান কোম্পানি বাংলাদেশে একটি শাখা হিসেবে কাজ করছি। বাকী ২৩০টি যেটিকে আপনি শাখা বলছেন সেগুলো আমাদের এজেন্সি।
একটি বিদেশী কোম্পানি হয়ে কীভাবে সারাদেশে শাখা খুলে ব্যবসা করছে জানতে চাইলে আইডিআরএর মুখপাত্র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ব্যবসা করতে হলে শাখা অফিস দরকার আছে। তিনি বলেন, মেটলাইফের কাছ থেকে শাখার নির্ধারিত ফি আদায়ের বিষয়টি আমরা আইডিআরএ’র পরবর্তী সভায় আলোচনা করবো।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাংলাদেশসহ মেটলাইফের কার্যক্রম রয়েছে মেক্সিকো, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এবং চিলিতে। এছাড়া ভারত, ল্যাটিন আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যেও কাজ করে মেটলাইফ। তবে প্রতিটি দেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে মেটলাইফ সে দেশের নিয়ম মেনে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করলেও বাংলাদেশে তারা অনেক নিয়ম-কানুন পরিপালন না করেই ব্যবসা করছে। ভারতে মেটলাইফ কয়েকটি স্থানীয় কোম্পানির সাথে যৌথ মালিকানায় ইন্ডিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড নামে অনুমোদন নেয়।
Posted ১০:০৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪
Desh Arthonity | Rina Sristy
Lk Cyber It Bd