ডেস্ক রিপোর্ট | বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি নয়। নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে তার। কোথায় থাকবেন, উচ্চশিক্ষা নেবেন কি না, কাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবেন কিংবা বিয়ে করবেন কি না, এসব সিদ্ধান্তে পরিবারের পক্ষ থেকে জোর করা যায় না। ভারতের বোম্বে হাইকোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এমনই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
পছন্দের যুবকের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া ২১ বছরের এক তরুণীকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে মায়ের করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় জীবনসঙ্গী বেছে নিলে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আদালতের বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ আবেদন করা যায় না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘাটে এবং বিচারপতি গৌতম এ আনখাদের সমন্বয়ে গঠিত বোম্বে হাইকোর্টের বিভাগীয় বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হায়দরাবাদের ওই তরুণী গত ১৫ জুন টিউশন ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। পরে সিসিটিভি ফুটেজে তাকে এক যুবকের সঙ্গে যেতে দেখা যায়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি আবার বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
এরপর মেয়েকে ফিরে পাওয়ার জন্য বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেন তার মা। অন্যদিকে ওই তরুণীও পুলিশের পদক্ষেপ এবং পরিবারের চাপ থেকে সুরক্ষা চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মিহির দেশাই। শুনানির সময় বিচারকেরা ওই তরুণীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন।
আদালতের কাছে তিনি জানান, নিজের ইচ্ছাতেই মায়ের বাড়ি ছেড়ে ওই যুবকের কাছে গিয়েছেন এবং তার সঙ্গেই থাকতে চান। তিনি আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে তার চেয়ে প্রায় ১০ বছর বড় এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। সেই চাপের কারণেই তিনি হায়দরাবাদ থেকে কোলহাপুর হয়ে মুম্বাইয়ে চলে যান।
আদালত আবেদনকারী তরুণী এবং তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। বিচারকেরা জানান, তরুণীকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন। নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কেও তিনি সচেতন বলে আদালতের মনে হয়েছে। এরপরই আদালত বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবা-মায়ের সম্পত্তি নন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন। তার জীবনসঙ্গী কে হবেন, কোথায় থাকবেন কিংবা কীভাবে জীবন কাটাবেন, এসব বিষয়ে পারিবারিক চাপ বা সামাজিক রীতিনীতি দিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলেন, নিজের বাসস্থান বেছে নেওয়া, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং বিয়ে করবেন কি না বা কাকে বিয়ে করবেন, এসবই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, পারিবারিক আবেগকে আইনি নিয়ন্ত্রণে পরিণত করা যায় না। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক থাকলেও সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আদালত স্পষ্ট করে দেন, বাবা-মা কিংবা রাষ্ট্র, কেউই কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তার স্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে ফিরতে বা নির্দিষ্ট কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য করতে পারে না। পারিবারিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা সম্প্রদায়ের রীতিনীতি কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপরে স্থান পেতে পারে না।
শুনানির সময় তরুণীর মা আদালতে ব্যক্তিগত হলফনামা দিয়ে জানান, মেয়েকে বিয়ের জন্য কোনও ধরনের চাপ দেওয়া হবে না। উচ্চশিক্ষা গ্রহণেও তাকে বাধা দেওয়া হবে না। এরপর আদালত তরুণীর আবেদনে সাড়া দিয়ে তেলেঙ্গানা পুলিশকে তার বিরুদ্ধে করা নিখোঁজের প্রতিবেদন বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন।
আদালত আরও বলেন, ওই তরুণীকে নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে কোনও চাপ দেওয়া যাবে না। এমনকি ফৌজদারি মামলার ভয় দেখিয়েও তাকে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করা যাবে না। বোম্বে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণকে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
Posted ৫:৫৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
Desh Arthonity | Touch Tuhin
Lk Cyber It Bd