নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট
স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য অনলাইন শপিংয়ের পরিবর্তে আলিবাবা তার বৈশ্বিক বি-টু-বি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশি কারখানা ও সরবরাহকারীদের ১৯০টিরও বেশি দেশের বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করে।
অনেক বাংলাদেশির কাছে আলিবাবা গ্রুপ আমাজন বা আলীএক্সপ্রেসের মতো একটি বিশাল চীনা অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। তাই যখন তারা জানতে পারেন, আলিবাবার বাংলাদেশেও একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবসা রয়েছে এবং তারা পণ্য অর্ডার করার জন্য ওয়েবসাইটটি ভিজিট করেন, তখন তারা বিস্মিত হন—কারণ তারা এখানে কেনাকাটা করতে পারেন না!
আলিবাবা ডটকম-এ অধিকাংশ পণ্য—যেমন পোশাক, ইলেকট্রনিকস বা গৃহস্থালির সামগ্রী বড় পরিমাণে মূলত পাইকারি ক্রেতা, আমদানিকারক এবং আন্তর্জাতিক সোর্সিং কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য অনলাইন শপিংয়ের পরিবর্তে আলিবাবা তার বৈশ্বিক বি-টু-বি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশি কারখানা ও সরবরাহকারীদের ১৯০টিরও বেশি দেশের বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছর আলিবাবা ডটকম–এর মাধ্যমে বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা প্রায় ১ কোটি ডলারের রপ্তানি ব্যবসা করেছে। সেখানে পোশাক ও হোম টেক্সটাইল থেকে শুরু করে পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে চারটি স্থানীয় চ্যানেল পার্টনারের মাধ্যমে ৩০০-এরও বেশি বাংলাদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করছে। প্রচলিত ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসের মতো আলিবাবা ডটকম বাংলাদেশে কোনো গুদাম, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা স্থানীয় শপিং সেবা পরিচালনা করে না।
আলিবাবা ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র চ্যানেল অপারেশন স্পেশালিস্ট ওয়াং কুইলিং ভ্যানিয়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “বাংলাদেশ মূলত আলিবাবা ডটকম–এর জন্য একটি কৌশলগত বৈশ্বিক সোর্সিং হাব।”
কোম্পানিটি ‘প্ল্যাটফর্ম-প্লাস-লোকাল-পার্টনার’ মডেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আলিবাবা ডটকম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বৈশ্বিক ক্রেতা নেটওয়ার্ক সরবরাহ করে; আর স্থানীয় পার্টনাররা রপ্তানিকারকদের অনবোর্ডিং, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করে।
কোম্পানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের স্থানীয় পার্টনারদের মধ্যে রয়েছে ট্রেডশি, মেইদাও, স্কাইটেক এবং ম্যাক্সিমো। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা অনলাইন স্টোরফ্রন্ট তৈরি করতে পারেন, বিভিন্ন ভাষায় পণ্য প্রদর্শন করতে পারেন, ক্রেতাদের অনুসন্ধান গ্রহণ করতে পারেন এবং আলিবাবার ‘রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (আরএফকিউ)’ সিস্টেম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অর্ডারের জন্য বিড করতে পারেন।
কোম্পানিটি ডিজিটাল রপ্তানি, পণ্য উপস্থাপন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইন বিক্রয় কৌশল বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করে।
বাংলাদেশে কার্যক্রম বাড়লেও আলিবাবা ডটকম জানিয়েছে, দেশটিতে ভোক্তা শপিং, ডেলিভারি সেবা বা লজিস্টিক হাব চালুর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তাদের নেই।
বরং কোম্পানিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্য সংগঠন এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ঢাকায় একটি ছোট প্রতিনিধি অফিস খোলার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ওয়াং বলেন, “আমাদের বিনিয়োগ মূলত মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিনির্ভর, অবকাঠামোগতভাবে ভারী নয়।”
বিশ্বব্যাপী আলিবাবা ডটকম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বি-টু-বি সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম এবং এটি অ্যামাজন বিজনেস এবং ইন্ডিয়ামার্ট-এর মতো পাইকারি মার্কেটপ্লেসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।
শক্তিশালী উৎপাদন খাত ও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কোম্পানিটি বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে দেখে। তবে কর্মকর্তারা মনে করেন, ডিজিটাল রপ্তানিতে দেশটি এখনও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
বিধিনিষেধ, ব্যাংকিং প্রক্রিয়া বড় চ্যালেঞ্জ
আলিবাবা ইন্টারন্যাশনাল–এর বাংলাদেশ বিষয়ক ডোমেস্টিক চ্যানেল ম্যানেজার সোনোবার মাইরা বলেন, বাংলাদেশে বি-টু-বি ই-এক্সপোর্টের প্রবেশ হার ১৫ শতাংশের নিচে, যেখানে ভিয়েতনাম ও ভারতে এটি ৩০ শতাংশের বেশি।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বিধি ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ছোট রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। “পেমেন্ট কনফার্মেশনে বিলম্ব এবং পুরনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রায়ই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ছোট রপ্তানি লেনদেনে সমস্যা তৈরি করে।”
এই সমস্যার সমাধানে মাইরা জানান, তারা স্থানীয় পেমেন্ট সমাধানের পাইলট প্রকল্প চালাচ্ছে এবং ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে (যার মধ্যে বিকাশও রয়েছে) অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করছে।
তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো— সীমান্ত পারাপারের লেনদেন সহজ করা এবং লেনদেনের দক্ষতা বাড়ানো, বিশেষ করে ১,০০০ ডলারের নিচের ছোট রপ্তানি অর্ডারের ক্ষেত্রে।
মাইরা বলেন, “আমরা বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা ও সেটেলমেন্ট বিলম্ব সমস্যার সমাধানে স্থানীয়কৃত পেমেন্ট সমাধানের পাইলট চালাচ্ছি। এই উদ্যোগ ট্রেড অ্যাসিউরেন্স সেবা শক্তিশালী করা এবং ছোট রপ্তানিকারকদের সহায়তা করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।”
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
সোনোবার মাইরা আরও জানান, আগামী তিন বছরে ১,০০০-এরও বেশি বাংলাদেশি রপ্তানিকারককে বৈশ্বিক বাজারে ডিজিটালি সক্রিয় করতে সহায়তা করাই আলিবাবার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
কোম্পানিটি সম্প্রতি বাংলাদেশের একাধিক ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে— বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি। এসব সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে— রপ্তানিকারক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, অনবোর্ডিং সহায়তা এবং ক্রেতা-ম্যাচমেকিং ইভেন্ট।
মাইরা বলেন, বৈশ্বিক ক্রেতারা সোর্সিং গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনছে এবং অনলাইন প্রোকিউরমেন্ট সিস্টেমের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে—এই কারণে ডিজিটাল সোর্সিং প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল বৈশ্বিক ডিজিটাল বাণিজ্য বাজারের পূর্ণ সুবিধা নিতে বাংলাদেশকে দ্রুততর বৈদেশিক মুদ্রা অনুমোদন, স্পষ্ট ডিজিটাল বাণিজ্য বিধিমালা এবং আরও দক্ষ রপ্তানি পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
Posted ১২:১০ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
Desh Arthonity | Touch Tuhin
Lk Cyber It Bd