রাস্তা-সেতু নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ড ইস্যু চূড়ান্ত

গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) অর্থের জন্য সুকুক বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তিন হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মেয়াদ হবে সাত বছর।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ্ অ্যাডভাইজরি কমিটি বৈঠক করে বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানা গেছে, ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’ এই সুকুক বন্ডের অর্থ দিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। সুকুকটির নাম দেওয়া হয়েছে ইসটিনা ও ইজারা। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিআইডি) মাধ্যমে প্রকল্পটির আওতায় বাংলাদেশের আট বিভাগের ৫৮টি উপজেলায় ৮২টি সেতু নির্মাণের কাজ চলমান। যার মোট দৈর্ঘ্য ১৭ হাজার ৬৯৭ মিটার, ৩৮ হাজার ৮০০ মিটার সংযোগ সড়ক এবং চার হাজার ২৩০ মিটার নদী শাসনের কাজ বাস্তবায়ন।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রকল্প এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ও অকৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজীকরণ ও ব্যয় হ্রাস এবং স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হবে।




আসছে ২ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ড

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠাগুলোর আগ্রহ থাকায় আবারও দুই হাজার কোটি টাকার ৫ বছর মেয়াদী সুকুক বন্ড বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। দুই ধাপে আগামী মার্চ মাসের মধ্যে ওই বন্ড ইস্যু হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ‘ক্যাশ অ্যান্ড ডেবিট ম্যানেজমেন্ট কমিটি’র (সিডিএমসি) এক সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা  বলেন, সিডিএমসি’র ৫২তম সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানেই উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই বন্ড বাজারে ছাড়া হবে।

সভা সূত্রে আরও জানা যায়, শরীয়াহ ভিত্তিক কনভেনশনাল ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো ও শাখার ২০২৩ সালে নভেম্বর ভিত্তিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় সাড়ে ৭ শত কোটি টাকা উদ্ভূত তারল্য বিদ্যমান। এছাড়া কনভেনশনাল ব্যাংকের উদ্ভূত তারল্যের পরিমাণ ৩ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে সুকুক ক্রয়ে উৎসাহ কিছুটা হ্রাস পেলেও বর্তমানে অনুমোদিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠাগুলোর আগ্রহ কিছু টাকা ফিরে এসেছে।

ইতোপূর্বে সুকুক হতে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা আহরণ হয়েছে। এই অবস্থায় জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার কোটি টাকা করে ৫ বছর মেয়াদি সুকুক ইস্যু করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথম পর্যায়ে সারা পাওয়া গেলেই দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার কোটি টাকা সুকুক ইস্যু করার উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ‘সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ নামে প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য সর্বপ্রথম সুকুক বন্ড (ইজারা সুকুক) ইস্যু করা হয়। যেখানে মূল উদ্যোক্তা হলো বাংলাদেশ সরকার ও মধ্যস্থতাকারী হলো বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকারের অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং প্রথম দফায় ৮ হাজার কোটি টাকার বন্ড চালু করা হয়। এটিই সরকারের উদ্যোগে চালু হওয়া প্রথম ইসলামী বন্ড। সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক চার হাজার কোটি টাকা করে দুই দফায় বিনিয়োগকারীদের কাছে সুকুকের সার্টিফিকেট ইস্যু করে।

আরবি শব্দ সুকুক অর্থ হচ্ছে সিলমোহর লাগিয়ে কাউকে অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়ার আইনি দলিল। সুকুক ইসলামি রীতি অনুসরণ করা হয়। এখানে সুদের ব্যবস্থা নেই, আছে মুনাফা; যা আগে থেকে নির্ধারণের উপায় নেই। যেটি বাৎসরিক কর্মকাণ্ডের আয়-ব্যায়ের ওপর নির্ধারিত হয়।




বিএসইসি ও ইউএনডিপি’র সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সোমবার (৩ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সিকিউরিটিজ কমিশনের ভবনে ‘টেকনিক্যাল কো-অপারেশন ফর স্ট্রেনদেনিং দি ইকোসিস্টেম অব এসডিজি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিএসইসি’র পক্ষে চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এ সময় ইউএনডিপি’র উপ-আবাসিক প্রতিনিধি নগুয়েন থি এনগোক ভ্যান এবং বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদসহ উভয় সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ সমঝোতা স্মারকের অধীনে ইউএনডিপি বাংলাদেশ এসডিজি ইমপ্যাক্ট স্ট্যান্ডার্ডের ওপর ভিত্তি করে প্রভাব পরিমাপ ও রিপোর্টিং কাঠামো ডিজাইন করতে সহায়তা করবে। এছাড়া, বন্ড বরাদ্দ এবং প্রভাব রিপোর্টিং উন্নয়ন, ইস্যু পূর্ববর্তী থেকে শুরু করে ইস্যু পরবর্তী পর্যন্ত এসডিজি থিম্যাটিক বন্ড পরিচালনা, ইস্যুকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে থিম্যাটিক বন্ড জনপ্রিয় করার জন্য স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততায় সহায়তা এবং সর্বোপরি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তাসহ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে কাজ করবে ইউএনডিপি বাংলাদেশ।

বিএসইসি’র চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বিএসইসি ও ইউএনডিপি’র অংশীদারত্বের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই উদ্যোগটি বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিএসইসি প্রাণবন্ত বন্ড বাজার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। আমরা নির্দিষ্ট আয়ের সিকিউরিটিজের জন্য আমাদের গাইডলাইনে গ্রিন বন্ডের জন্য একটি পৃথক বিভাগও অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমি বিশ্বাস করি, থিম্যাটিক বন্ড বা সুকুকের মতো অত্যাধুনিক পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন আর্থিক পণ্যগুলোকে জনপ্রিয়করণ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য দক্ষ পুঁজি সংগ্রহের পাশাপাশি সামগ্রিক বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।’

অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব করার গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে এটি শুরু করার ওপর জোর দেন বিএসইসি’র চেয়ারম্যান। তিনি ফ্রেমওয়ার্ক ডিজাইন এবং এর প্রাথমিক পাইলটিংয়ে সহায়তার ক্ষেত্রে কমিশনের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন এবং সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার তার বক্তব্যে থিম্যাটিক বন্ড ফ্রেমওয়ার্ক এবং প্রদত্ত প্রযুক্তিগত সহায়তার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘থিম্যাটিক বন্ড ফ্রেমওয়ার্ক এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশে এসডিজি অর্জনের জন্য পুঁজি সংগ্রহের ক্ষেত্রে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে। ইউএনডিপি বাংলাদেশে এসডিজি অর্থায়নের জন্য একটি ইকোসিস্টেম তৈরিতে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এজেন্ডা ২০৩০ এবং বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্রচেষ্টা এবং প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়নে নতুন অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রটিতে বাংলাদেশকে সমর্থন করার সামগ্রিক লক্ষ্য নিয়ে বিএসইসির সঙ্গে এই সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরে খুবই আনন্দিত।’

বিএসইসি এবং ইউএনডিপির মধ্যে সহযোগিতার লক্ষ্য হলো—এসডিজি এবং থিম্যাটিক বন্ডের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রজেক্ট গড়ে তোলা সহজতর হবে। সর্বোপরি দেশের বন্ড বাজার আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও টেকসই রূপ লাভ করবে।