সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিতে এসএমই ফাউন্ডেশন ও প্রাইম ব্যাংকের চুক্তি

দেশের শিল্প খাতের উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে এসএমই ফাউন্ডেশন এবং প্রাইম ব্যাংক একটি পুনঃঅর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সরকারের ৩০০ কোটি টাকার ‘রিভলভিং ফান্ড’-এর আওতায় এবং ক্রেডিট হোলসেলিং নির্দেশিকা অনুসরণ করে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) ব্যাংকটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

এই চুক্তির অধীনে, প্রাইম ব্যাংক যোগ্য উদ্যোক্তাদের বার্ষিক সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে স্বল্পমূল্যের ঋণ প্রদান করবে। এই অর্থায়ন সুবিধাটি অত্যন্ত সহজলভ্য করা হয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১ লক্ষ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপ কমাতে এই কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সময়সীমা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ছয় মাসের একটি গ্রেস পিরিয়ডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী উদ্যোক্তা এবং নির্দিষ্ট শিল্প ক্লাস্টারে কর্মরত উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও আইসিটি খাতের তরুণ উদ্ভাবক, আমদানি-বিকল্প পণ্য উৎপাদনকারী এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ বা সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক জামানত বা স্থাবর সম্পত্তির বাধ্যবাধকতা না থাকায়, যাদের পর্যাপ্ত সম্পদ নেই তারাও নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন।

উভয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব জাতীয় অর্থনীতিতে এই তহবিলের প্রভাব নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কেবল ঋণ প্রদানের মধ্যেই এই কর্মসূচি সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎসাহিত করার মাধ্যমে টেকসই শিল্পায়ন এবং বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্যও রাখে। এম. নাজিম এ. চৌধুরী এবং আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন যে, এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব কেবল কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবে না, বরং বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতের সামগ্রিক সক্ষমতাকেও আরও শক্তিশালী করবে।




জামানত ছাড়াই ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে আগামী পাঁচ বছর ব্যাংক কী পরিমাণ ঋণ দেবে তার লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ছোট ছোট উদ্যোক্তারা জামানত ছাড়াই পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ব্যবসা সংক্রান্ত সনদ দিয়েই মিলবে তাদের এ ঋণ সুবিধা।

সোমবার (১৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগামস ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আমির উদ্দিন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিএমএসএমই বিভাগের পরিচালক নওশাদ মুস্তফা, সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
একই দিন এ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি মাস্টার সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেখানে বলা হয়, আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে ব্যাংকের মোট ঋণ স্থিতির ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দিতে হবে। যার মধ্যে ১৫ শতাংশ পাবেন নারী উদ্যোক্তা। সার্কুলারে ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তা’ নামের একটি নতুন শ্রেণি যুক্ত করা হয়েছে। যেখান থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তার বিষয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ এর আলোকে ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্প খাতের উদ্যোক্তা’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণীত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ অনুযায়ী এই উদ্যোক্তাদের সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। ইউনিক বিজনেস আইডেনটিফিকেশন (ইউবিআইডি), ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিফিকেশন (ডিবিআইডি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে পারসোনাল রিটেইল অ্যাকাউন্ট (পিআরএ) আছে এমন শ্রমনির্ভর অতিক্ষুদ্র বা ভাসমান উদ্যোক্তা বা সেবাপ্রদানকারীরা ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তা’ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

তিন অপ্রাতিষ্ঠানিক (উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসা) খাতের উদ্যোক্তারা, যাদের জনবল পারিবারিক সদস্যসহ ১০ জনের বেশি নয় তারা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। এই শ্রেণির উদ্যোক্তাদের টার্নওভারের শর্ত রাখা হয়নি। জমি ও কারখানা ভবন ছাড়া প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ তাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদের মূল্য পাঁচ লাখ টাকার কম হতে হবে।

এছাড়া মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। যাদের ১২১ থেকে ৩০০ কর্মী আছেন, এমন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান অথবা এক হাজার কর্মী আছেন এমন শ্রমঘন শিল্পে এই ঋণ দেওয়া হবে। মাঝারি শিল্পের মধ্যে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ৫১ থেকে ১২০ হতে হবে বলে জানানো হয় সিএমএসএমই খাতের নতুন নীতিমালায়।

এছাড়া মাইক্রো শিল্পে সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা ও ক্ষুদ্র শিল্পে ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে। মাঝারি শিল্পের ট্রেডিং খাতে ১০ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ট্রেডিং ও সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হবে। আর মাইক্রো শিল্পের ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ঋণ এবং কুটিরশিল্পে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে।

নতুন সিএমএসএমই নীতিমালায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ আবেদনের সিআইবি চার্জ মুক্ত রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক জামানত বিহীন ঋণের বিপরীতে পুনঃঅর্থায়নের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

বিগত ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ বছরের জন্য সিএমএসএমই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সে নীতিমালার মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন এ নীতিমালা জারি করা হয়েছে।




সিএমএসএমইর সেবা একক সংস্থায় আনার সুপারিশ

 

এশিয়ার অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতের নিবন্ধন, অর্থায়ন, ব্যবসা উন্নয়নসহ সব সেবা একক সংস্থার অধীনে হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য আলাদা এবং মাঝারিশিল্পের জন্য আলাদা নীতিমালা দরকার। গতকাল রোববার এসএমই ফাউন্ডেশন এবং আইএলও বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণে জাতীয় অংশীজন পরামর্শ সভা ও নীতি সংলাপ’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন মত দেন। এসএমই ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এমপি। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানে এলাহী এবং এফবিসিসিআই সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। আরও বক্তব্য দেন আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পুটিআইনেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএলও বাংলাদেশের এসএমই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ গুনজান দালাকোটি এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক নাজিম হাসান সাত্তার।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, এশিয়ার প্রায় সব দেশে সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নে একক সংস্থা থাকলেও বাংলাদেশে ভিন্ন সংস্থা থাকায় সমন্বয়হীনতার কারণে প্রয়োজনীয় সেবা পান না উদ্যোক্তারা। এ জন্য সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, অনুমোদন কর প্রদান একই প্রতিষ্ঠান থেকে হওয়া প্রয়োজন।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, কভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তারাও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এসএমই ফাউন্ডেশনসহ সরকার তাদের সহায়তার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এসডিজির বাস্তবায়নসহ ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসএমই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।