সঞ্চয়পত্রের সার্ভার ব্যবহার করে জালিয়াতির অভিযোগ 

সঞ্চয়পত্রের সার্ভার ব্যবহার করে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সার্ভার ব্যবহার করে অন্য গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে বাংলাদেশ ব্যাংক এ জালিয়াতি আটকে দেয়। এছাড়া এ বিষয়ে মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে আজ (বুধবার) মতিঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে গত পরশুদিন একটি জিডি হয়েছে আমাদের থানায়। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখছি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস থেকে গত বৃহস্পতিবার ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কেনেন এক ব্যক্তি। তার ব্যাংক হিসাবটি আছে অগ্রণী ব্যাংকের জাতীয় প্রেস ক্লাব শাখায়। চার দিনের মাথায় গত সোমবার এই সঞ্চয়পত্র ভাঙানো হয় এবং টাকা নেওয়া হয় এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুর উপশাখার অন্য এক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে। ওই টাকা একই দিনে ব্যাংকটির ঢাকার শ্যামলী শাখা থেকে তুলে নেওয়া হয়।

একই প্রক্রিয়ায় একই দিনে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ লাখ ও এনআরবি ব্যাংকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এলে তারা তা আটকে দেয়।

আরও জানা যায়, গত আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকসহ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের তিন লাখ ৪০ হাজার ৭১ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর ও পোস্ট অফিস মিলে প্রায় ১২ হাজার শাখা থেকে এসব সঞ্চয়পত্র কেনা ও ভাঙানো হয়। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে। অন্য কোথাও থেকে একই ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা এখনও জানা যায়নি। সঞ্চয়পত্রের এই লেনদেন নিয়ন্ত্রণ হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্ভার ব্যবহার করে। চিহ্নিত প্রতারণার ঘটনা তিনটি এই সার্ভার হ্যাক করে করা হয়েছে কিনা, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।




অর্থবছরের ৬ মাসে কমেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি

চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ইতিবাচক ধারা ফিরলেও অক্টোবর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেই চলেছে। এসময় বিক্রির পরিবর্তে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতাও বেড়েছে। এতে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এসময় সার্বিকভাবে সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে ভাঙানোর সংখ্যা বেশি ছিল।

এদিকে চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকার ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয়, যা বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যবহার হয়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। তাছাড়া নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয়প্রবণতাও কমেছে। আবার আমানত ও সরকারের বিল-বন্ডের সুদের হার বেড়েছে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংক ও বিল-বন্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে। এসব কারণে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ কমেছে। তবে নতুন বছরের জানুয়ারি থেকে সুদহার বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৩০ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। বিপরীতে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। ফলে অর্থবছরের ছয় মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক প্রায় ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভাঙানোর প্রবণতা কম থাকায় নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ধারায় ছিল। তবে পরের টানা তিন মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতা বেড়ে যায়, এতে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। একই মাসে (ডিসেম্বর) ভাঙানো হয়েছে ৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এতে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক হয়েছে ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এর আগের মাস নভেম্বরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নভেম্বরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয় ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৫ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার এবং ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে অক্টোবর মাসে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ঋণাত্মক ছিল ৩ হাজার ২২৪ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাস ব্যতিক্রম ছিল। প্রথম মাস জুলাইতে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ছিল ৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। সে হিসেবে জুলাইয়ে নিট বিনিয়োগ আসে ২ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১১২ কোটি টাকা। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই মাসে নিট বিনিয়োগ ছিল ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ৫ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। একই মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর পরিমাণ ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে নিট বিনিয়োগ ছিল ৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা। যার কারণে একক মাস হিসেবে শীর্ষে ছিল সেপ্টেম্বর।




৩ দিন বন্ধ সঞ্চয়পত্রের সেবা

সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের জন‌্য গত তিন দিন ধরে সঞ্চয়পত্রের সেবা কার্যক্রম বন্ধ র‌য়ে‌ছে। ফলে কোনো ধরনের সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ বিভিন্ন স্কিমের মুনাফার অর্থ তোলা যাচ্ছে না। এতে ক‌রে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা।

এদিকে অধিদপ্তর জানায়, সফটওয়্যার আপগ্রেডেশন কাজ চল‌ছে। যার কারণে সেবা সাময়িক বন্ধ রয়েছে।

সোমবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার পর থেকে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সার্ভার সচল করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের পরিচালক রোকনুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে জানান, বিষয়টি সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর দে‌খে। তারা ব‌লে‌ছিলেন আজ দুপু‌র ১২টা নাগাদ চালু হবে কিন্তু এখন পর্যন্ত সার্ভার সচল হয়নি।

তবে সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কাজটি করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে খুব শিগগিরই সার্ভার চালু হবে।

 




সুদহার বাড়ছে সঞ্চয়পত্রে

সঞ্চয়পত্রে সুদহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সুদহার অন্তত ১ শতাংশ বাড়ছে। তবে সাড়ে সাত লাখ টাকা বা এর কম বিনিয়োগকারীরা সুদ কিছুটা বেশি পাবেন।

 

বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর সুদের হার পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। শিগগির এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১ জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্রের নতুন সুদহার কার্যকর হবে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার ৫ বছর ও ২ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের গড় সুদের হার (সর্বশেষ ছয় মাসের নিলামের ভিত্তিতে) অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। তবে সাড়ে সাত লাখ টাকা বা এর কম বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ ৫০ বেসিস পর্যন্ত প্রিমিয়াম যোগ হবে। এতে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে কিছুটা বেশি সুদ পাওয়া যাবে।

নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করে জানুয়ারি থেকে আগামী জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্রের সম্ভাব্য সুদহার নির্ধারণ করেছে সরকার। সেই হিসাবে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা বা এ কম বিনিয়োগকারীদের সুদহার দাঁড়াবে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর বেশি অঙ্কের বিনিয়োগকারীদের সুদহার দাঁড়াবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সুদহার রয়েছে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

তিন বছর মেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফা সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে সম্ভাব্য সুদহার ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে সুদহার হবে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। বর্তমানে এ স্কিমে সুদহার হচ্ছে ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সুদহার পাওয়া যাবে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে সুদহার হবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বর্তমানে এ স্কিমে সুদহার হচ্ছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।




সঞ্চয়পত্রে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিনিয়োগ সুবিধা না দেওয়ার নির্দেশ

সঞ্চয়পত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগের সুবিধা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বিষয়টি পরিপালনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রোববার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট এ নির্দেশনা দেন।

সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এ নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। সার্কুলার অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রে পুনর্বিনিয়োগের সুবিধা পাবেন না। পাবেন শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা। এদিকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরিরত বাংলাদেশি নাবিক (মেরিনার) ও এয়ারওয়েজ কোম্পানিতে চাকরিরত বাংলাদেশি পাইলট ও কেবিন ক্রুরা ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এসব বিষয় এতদিন অস্পষ্ট ছিল।




জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে

ধারাবাহিকভাবে কমার মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে এ উৎস থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুলাই মাসে মোট ৭ হাজার ৮৬১ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদপূর্তির এবং মেয়াদ শেষের আগে নগদায়ন হয়েছে ৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। এর মানে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ পেয়েছে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। গত অর্থবছর যেখানে সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ কমে যায় ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।

জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতি কমাতে ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণ কমিয়ে সঞ্চয়পত্র ও বিদেশি উৎসে বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। এরই মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণ কমতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমেছে ১০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। গত অর্থবছর ব্যাংক থেকে রেকর্ড ১ লাখ প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয় সরকার।

 

বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর সরকার বিদেশি উৎসের পাশাপাশি ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চলতি অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকার ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ছিল।

 

জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইতে ডাকঘরের মাধ্যমে বিক্রি কমেছে ১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকের মাধ্যমে নিট বিক্রি বেড়েছে ৪ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। আর সঞ্চয় ব্যুরোর মাধ্যমে ১৭৫ কোটি টাকা বেড়েছে।




জুনেও সঞ্চয়পত্রে ঋণের চেয়ে পরিশোধ বেশি

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে নানান শর্ত আর মূল্যস্ফীতির চাপে নতুন বিনিয়োগ কমেছে সাধারণের। বিপরীতে সঞ্চয়পত্র ভাঙছেন বেশি মানুষ। সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র কিনেছেন তার চেয়ে বেশি ভেঙেছেন গ্রাহকরা। একইভাবে চলতি বছরের জুন মাসেও নিট বিক্রির ঘাটতি (ঋণাত্মক) ছিল ২৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানান শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। কোনো গ্রাহকের ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে রিটার্নের সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব রকম সঞ্চয়পত্রের সুদহার ২ শতাংশ কমানো হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সীমাও কমানো হয়। আর ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করে সরকার। এতে বিক্রি কমছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১২ মাসে (জুলাই-জুন) মোট ৮০ হাজার ৮৫৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে মুনাফা ও মূল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৮৪ হাজার ১৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এসময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি যা হয়েছে সেটা দিয়ে গ্রাহকদের আগে বিনিয়োগ করা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ সম্ভব হয়নি। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ কমে ঋণাত্মক (নেগেটিভ) প্রবৃদ্ধিতে নেমেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ব্যাংক থেকে উল্টো ৩ হাজার ২৯৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেছে।

অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের সবশেষ মাস এবং চলতি বছরে একক মাস জুনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ১৩৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার। একই মাসে মূল ও মুনাফা বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৬ হাজার ৪০৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ নিট বিক্রির ঘাটতি (ঋণাত্মক) ছিল ২৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি পূরণে সঞ্চয়পত্রের নির্ভরতাও কমিয়ে ফেলছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয় ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছর ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা।

দেশে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৫২, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬, পাঁচ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮, তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হলেও এখনো এর সুদহার ব্যাংকের তুলনায় বেশি।




সড়ক দুর্ঘটনায় জম্ম নেওয়া শিশুর জন্য সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের নির্দেশ

দেশের আলোচিত ঘটনা, ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মৃত্যুর আগে জন্ম নেওয়া শিশু ফাতেমা ও তার পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে থাকা ১৩ লাখ ১১ হাজার টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত একইসঙ্গে শিশু ও শিশুর পরিবারকে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে।

এ টাকা দিয়েও সঞ্চয়পত্র কিনে দিতে বলেছেন উক্ত আদালত। সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ দিয়ে শিশু ফাতেমা, তার দুই ভাই-বোন ও দাদীর সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা হবে।

এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে বৃহস্পতিবার (৩০ মার্চ) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহসিব হোসাইন। ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষে ছিলেন রাফিউল ইসলাম ও রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।

আইনজীবী রাফিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আদালত আদেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিটকারী আইনজীবীকে ট্রাস্টি বোর্ডে একটি আবেদন করতে বলেছেন। আবেদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টি বোর্ডকে নিহত রত্না বেগমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন আদালত।

রিটকারী আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া শিশুর জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ১৩ লাখ ১১ হাজার টাকা ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের কাছে রয়েছে। এ টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনে শিশু ফাতেমা, তার ভাই ইবাদত হোসেন ও বোন জান্নাতের কল্যাণে ব্যয় করতে বলেছেন আদালত। এছাড়া ট্রাস্টি বোর্ডকেও দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ত্রিশালের কোর্ট ভবন এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাক-চাপায় প্রাণ হারান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম (৩২), তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম (৪০) এবং তাদের ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা। এ সময় অলৌকিকভাবে মায়ের গর্ভ ফেটে ভূমিষ্ঠ হয় ফুটফুটে এক নবজাতক। পরে নবজাতকটিকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে নেওয়ার পর জানা যায়, জীবিত আছে নবজাতকটি। পরবর্তীতে যার নাম রাখা হয় ফাতেমা।