বেনাপোল দিয়ে এলো রুপিতে কেনা গাড়ির প্রথম চালান

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রুপিতে বাণিজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ভারত থেকে রুপিতে কেনা ৩০টি লরির (ট্রাক) প্রথম চালান মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে এসেছে। এলসি খোলার ১৫ দিনের মাথায় এসব পণ্য দেশে এলো।

বেনাপোল কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ভারতের পেট্রাপোল বন্দর হয়ে এক কোটি ২৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৬০ রুপি মূল্যের ৩০টি লরি নিয়ে চারটি ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার নিতা কোম্পানি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান টাটা মোটরসের কাছ থেকে এসব লরি কিনেছে। আমদানির পর পণ্যের চালানটি বেনাপোল বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে রাখা হয়েছে।। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বেনাপোল বন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আব্দুল জলিল।

তিনি বলেন, ‘ডলারের পরিবর্তে রুপিতে ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি শুরু হয়েছে। আমদানির প্রথম চালান মঙ্গলবার বেনাপোল বন্দরে পৌঁছায়। রুপিতে পণ্য আমদানি হওয়ায় ডলারের ওপর চাপ কমবে।’

আমদানিকারক নিতা কোম্পানি লিমিটেডের যশোর এরিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রুপিতে এলসি খোলার ১৫ দিনের মাথায় প্রথম পণ্যের চালান দেশে এসেছে।’

এর আগে গত ১১ জুলাই ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ভারতীয় হাইকমিশন দুই দেশের বাণিজ্যে রুপি ব্যবহারের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রফতানি এবং ভারত থেকে আমদানি-উভয় ক্ষেত্রে এখন থেকে মার্কিন ডলারের পাশাপাশি রুপি ব্যবহার করা যাবে।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার তানভীর আহমেদ বলেন, ‘রুপির মাধ্যমে ভারত থেকে কেনা প্রথম পণ্যের চালান আমদানি হয়েছে। রুপিতে পণ্য আমদানি শুরু হওয়ায় ডলারের ওপর চাপ কমবে।’

বন্দরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রুপিতে বাণিজ্য শুরু হওয়ায় দুই দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়বে। রুপিতে বাণিজ্য ইতিবাচক। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে। এটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সুলতান মাহামুদ বিপুল বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ডলারের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি চলে আসছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো বাণিজ্য হয়। তবে এর মধ্যে ভারত থেকে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় আসে। অর্থাৎ দুই বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হতে পারে রুপিতে। তবে ভারতে রফতানি বাড়াতে পারলে সে হিসাব পালটে যাবে। ডলারের নির্ভরতা কমবে।’

পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘আগে শুধুমাত্র ডলারে বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো হতো। এখন থেকে রুপিতে পণ্য পাঠানো হচ্ছে। আজ প্রথম চালানে এক কোটি ২৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৬০ রুপির পণ্য বাংলাদেশে গেছে।’

বেনাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কাস্টম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। আর্থিকভাবে উপকৃত হয় ভারত। রুপিতে বাণিজ্য চালু হওয়ায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সুবিধা হয়েছে।’

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সামছুর রহমান বলেন, ‘চলমান ডলার সংকটের সময়ে বাণিজ্য সহজ করতে রুপিতে আমদানি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এতে আমদানি-রফতানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়বে। সেইসঙ্গে শ্রমিকদের বসে থাকতে হবে না।’




রুপিতে লেনদেন উদ্বোধন ১১ জুলাই

বৈশ্বিক বাণিজ্য লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মার্কিন মুদ্রা ডলার। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ডলারেই। তবে এখন ব্যতিক্রম আসতে শুরু করেছে। চীনা মুদ্রা ইউয়ানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন। এবার বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করতে যাচ্ছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১১ জুলাই রুপিতে লেনদেনের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে। অবশ্য ভারত ডলারের পাশাপাশি রুপিতে অনেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করেছে আগে থেকেই। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথমবারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও ইস্টার্ন ব্যাংক রুপি লেনদেনে বিশেষ (ভস্ট্রো) অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের অনুমোদন পেয়েছে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকও অনুমোদনের অপেক্ষায়।

এর আগে সোনালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডকে (ইবিএল) স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও আইসিআইসিআই ব্যাংকের হিসাব খুলতে অনুমোদন দিয়েছিল। গত সপ্তাহে ইবিকএলকে আরবিআই অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে লেনদেন করতে সমস্যা থাকলো না। গ্রাহক পেলেই লেনদেন শুরু হবে। যদিও আগামী ১১ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত রুপিতে দুই দেশের লেনদেন শুরু হবে আনুষ্ঠানিকভাবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক জানান, রুপিতে লেনদেন শুরু করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ ও ভারত। এটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে আমাদের দিনক্ষণ সব ঠিক আছে। গভর্নর রোববার হজ শেষে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন। রুপিতে লেনদেন হলে ডলার সাশ্রয় হবে।

ভারতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ অন্যদিকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এতে বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। এছাড়া ভ্রমণ, চিকিৎসা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি প্রতিবেশি এ রাষ্ট্র সফর করে থাকেন। গত ২০১৯ সালে ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন। রুপিতে লেনদেন হলে এখানে ডলার সাশ্রয় হবে। বর্তমানে দেশের মধ্যে ডলার সংকট চলছে।

তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ’র মতে, রুপিতে লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তৈরিতে সাহায্য করবে না। রুপি যতক্ষণ না আইএমএফ’র এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস) বাস্কেটে এ মুদ্রা অন্তর্ভুক্ত করে। এসডিআর বাস্কেটে অন্তর্ভুক্তির হওয়া মানে একটি আন্তর্জাতিক রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা হিসেবে গণ্য হবে। সডিআর বাস্কেটে অন্তর্ভুক্তি রয়েছে পাঁচটি মুদ্রা। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন ডলার, ইউরো, জাপানিজ ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং চীনের ইউয়ান। চীনের ইউয়ান ২০১৬ সালে পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে এসডিআর বাস্কেটে অন্তর্ভুক্ত করে আইএমএফ।




 ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্যের উদ্যোগ

বাংলাদেশ যাতে ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য করতে পারে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানিয়েছেন, মার্কিন ডলারের পরিবর্তে রুপি ব্যবহার করে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। কিছু দ্বিপাক্ষিক সমস্যা রয়েছে। সেগুলোর সমাধানের কাজ চলছে। ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি।

দুদেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেছিল এক হাজার ৬১৯ কোটি ডলারের। ঘাটতির পরিমাণ এক হাজার ৪১৯ কোটি ডলার।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এত বড় অঙ্কের বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার শুরু হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সব ধরনের পর্যালোচনা করেছে। এটি পর্যায়ক্রমে বাড়বে।

এলসি খোলার জন্য নির্দিষ্ট ডলার কোটা থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী এলসি খোলা হবে। আমরা রপ্তানির চেয়ে বেশি আমদানি করছি ভারত থেকে। এ জন্য বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

নাম না প্রকাশের শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য করতে হলে ভারত ও বাংলাদেশের ব্যাংকের সঙ্গে রুপি ব্যবহারের জন্য পৃথক চুক্তিতে সই করতে হবে। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়ে দুদেশের ব্যবসায়ীরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দুই দেশের বাণিজ্যের পুরো চিত্র ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি একটি প্রস্তাব আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে।

গত বছরের ২২-২৩ ডিসেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যবিষয়ক বাংলাদেশ-ভারত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ভারত উভয় দেশের জন্য বাণিজ্যের মাধ্যম হিসাবে রুপি চালু করার প্রস্তাব করেছিল।

এরপর চলতি এ বছর ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত জি-২০ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠকের ফাঁকে বিনিময় মুদ্রা হিসাবে ডলারের বিকল্প বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।

সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার ও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর শক্তিকান্ত দাস মার্কিন ডলারের পরিবর্তে রুপি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।