মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠানো যাবে রেমিট্যান্সের আড়াই লাখ টাকা

ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্স মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে বিতরণে সীমা বাড়াল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে সরাসরি রেমিট্যান্স সুবিধাভোগীর কাছে পাঠানো যাবে।

বুধবার (৬ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করে দেশে কার্যরত সব এমএফএস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান ও তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর নিকট পাঠিয়েছে।

এমএফএস হিসাবে বৈধ উপায়ে প্রেরিত রেমিট্যান্সের সীমা বৃদ্ধি সম্পর্কে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে আগত রেমিটেন্স মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে বিতরণের ক্ষেত্রে- ব্যাংকিং চ্যানেলে আগত রেমিট্যান্সের অর্থ সুবিধাভোগীর এমএফএস হিসাবে সরাসরি বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা (নগদ প্রণোদনার অর্থ ছাড়া) ব্যাংক সরাসরি সুবিধাভোগীর এমএফএস হিসাবে পাঠানো যাবে।

রেমিট্যান্স গ্রহণের ফলে কোনো বেনিফিশিয়ারি হিসাবের স্থিতি ৩ লাখ টাকা অতিক্রম করলে উক্ত হিসাবের স্থিতি পুনরায় ৩ লাখ টাকার মধ্যে না আসা পর্যন্ত ওই হিসাবে নতুন করে কোনো ক্যাশ ইন বা অ্যাড মানি করা যাবে না।

রেমিট্যান্সের খাত ব্যতীত এমএফএসের অন্যান্য সব লেনদেনের ক্ষেত্রে এ বিভাগের ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে জারি করা নির্দেশনা পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। এ নির্দেশনার ফলে ইতঃপূর্বে জারিকৃত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের সার্কুলার রহিত করা হল। নতুন এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।




মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ছাড়াল ২১ কোটি

হিসাব খুলতে কোনো টাকা লাগে না। শহর কিংবা গ্রামে নিমেষেই পাঠানো যায় অর্থ। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, ঋণ গ্রহণসহ যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নানা পরিষেবা। বিদেশ থেকে সহজে আসছে রেমিট্যান্স। মুহূর্তে সর্বত্র লেনদেনে গতিশীল করছে দেশের অর্থনীতি। এসব সুবিধার কারণে মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ওপর মানুষের আগ্রহের পাশাপাশি বাড়ছে নির্ভরশীলতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় চলতি বছরের আগস্ট মাসে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গড়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের সঙ্গে দিনদিন বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা। বর্তমানে বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশ, মাই ক্যাশ, শিওর ক্যাশসহ বিভিন্ন নামে ১৩টির মতো ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান এমএফএস সেবা দিচ্ছে। ২০২৩ সালের আগস্ট মাস শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার জন। অনেক গ্রাহক একাধিক সিম ব্যবহার করছেন। লেনদেনের সুবিধার্থে তারা একাধিক সিমে হিসাব খুলছেন।

নিবন্ধিত এসব হিসাবের মধ্যে পুরুষ গ্রাহক ১২ কোটি ২৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৪১ ও নারী ৮ কোটি ৯০ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৮ জন। আলোচিত সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৮টি।

নিয়ম অনুযায়ী, টানা তিন মাস একবারও লেনদেন ক‌রে‌নি এমন হিসাবকে নিষ্ক্রিয় বলে গণ্য করে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই হিসাবে আগস্ট শেষে সক্রিয় গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ১৯ লাখ ৬৩ হাজার।

এখন গ্রাহক ঘরে বসেই ডিজিটাল কেওয়াইসি (গ্রাহকসম্পর্কিত তথ্য) ফরম পূরণ করে সহজে ঝামেলা ছাড়াই এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলার সুযোগ পাচ্ছেন।

২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর মধ্য দিয়ে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে বিকাশ। বর্তমানে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সিংহভাগই বিকাশের দখলে। এরপরই রয়েছে ‘নগদ’র অবস্থান।

বিভিন্ন সেবা : মোবাইল ব্যাংকিংয়ে শুধু লেনদেন নয়, যুক্ত হচ্ছে অনেক নতুন নতুন সেবাও। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ সেবা মূল্য পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো অর্থাৎ রেমিট্যান্স প্রেরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এখন গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী ও গৃহপরিচারিকাদের বেতনও দেওয়া হচ্ছে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো সেবা মাধ্যম ব্যবহার করে। পোশাকখাতসহ শ্রমজীবীরা এমএফএস সেবার মাধ্যমে গ্রামে টাকা পাঠাচ্ছেন। যার ফলে দিনে দিনে নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। এই প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আগস্ট মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ঢুকেছে ৩৫ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা, আর উত্তোলন হয়েছে ৩০ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। এসময় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে ৩০ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এসময় প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে ৫১৫ কোটি টাকা।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা বাবদ বিতরণ হয় দুই হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন পরিষেবার তিন হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ হয় এবং কেনাকাটায় ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা লেনদেন হয়।




চার বছরের মধ্যে ব্যাংক কার্ডে সর্বোচ্চ লেনদেন

একটা সময় মানুষ ব্যাংক কার্ড নিতে আগ্রহ দেখাতেন না। তবে এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই কার্ড ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। তাই দিন দিন কার্ডের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জানুয়ারিতে কার্ডের মাধ্যমে ৩৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক কার্ডে ১৪ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়। ২০২০ সালের একই সময় হয় ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। আর ২০২১ সালে ২০ হাজার ৭৭৬ কোটি, ২০২২ সালে ২৭ হাজার ৩৪১ কোটি এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৩৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। অর্থাৎ গত চার বছরে ব্যাংক কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১৭০ শতাংশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক কার্ডের লেনদেনের মধ্যে দেশীয় মুদ্রায় ৩৯ হাজার ১৩৭ কোটি এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ৬২০ কোটি টাকা লেনদেন হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি শেষে দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে তিন কোটি দুই লাখ ৪৪ হাজার ৯৬। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক খাতে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল এক কোটি ৫২ লাখ ৪৪ হাজার ৩২৮। সেই হিসেবে পাঁচ বছর কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৮। একইভাবে জানুয়ারি শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৩। ২০১৯ সালের জানুয়ারি শেষে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৩৩। ফলে পাঁচ বছর ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে আট লাখ ২৩ হাজার ৪০।

সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে মাসে ডেবিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৩৬ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর আগে কখনো ডেবিট কার্ডে এক মাসে এত লেনদেন হয়নি। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ৩৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে জানুয়ারিতে লেনদেন হয় দুই হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। যদিও গত জুলাই ক্রেডিট কার্ডে দুই হাজার ৫৭৮ কোটি টাকার সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছিল। এটিএম, সিআরএম, পয়েন্ট অব সেলস ও ই-কমার্স কেনাকাটায় এসব লেনদেন হয়েছে।

কার্ড দিয়ে এটিএম থেকে গত জানুয়ারিতে ২৯ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। একইভাবে পিওএসের মাধ্যমে জানুয়ারি দুই হাজার ৬২১ কোটি টাকার লেনদেন হয়। পিওএস সাধারণত কেনাকাটা, উড়োজাহাজের টিকিট কেনা এবং হোটেলের ভাড়া দেয়ার সময় ব্যবহার করা হয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, কভিড-১৯ লকডাউনের দুই বছর পর জীবন স্বাভাবিক হওয়ার সময় থেকে লেনদেন বেড়েছে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এখনও নগদ অর্থ ব্যবহার করেন। তবে প্রতিদিনের লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে।

তারা বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারির কারণে ই-কমার্স লেনদেন অনেক কমে গেছে। না হলে কার্ড লেনদেন বেড়ে যেত।

ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে উৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এখন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং দেবা দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, অনলাইন সিআইবি রিপোর্ট, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড ও বিভিন্ন প্রযুক্তির এটিএম এসব সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।