গাজীপুরে পুলিশ-শ্রমিক পাল্টাপাল্টি ধাওয়া

মজুরি বোর্ড ঘোষিত সর্বনিম্ন মজুরি প্রত্যাখ্যান করে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোড় এলাকায় আন্দোলনরত কারখানা শ্রমিকদের সাথে ফের সংঘর্ষ হয়েছে পুলিশের। শ্রমিকরা মহাসড়কে কাঠ, গাছের গুড়ি ফেলে অবরোধ করলে পুলিশ টিয়ার শেল ছুঁড়ে তাদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।

বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) সকাল থেকেই শ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় ও চান্দনা চৌরাস্তা-শিববাড়ি সড়কে আন্দোলন শুরু করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

জানা গেছে, কারখানা শ্রমিকদের নূন্যতম বেতন ২৩হাজার টাকা করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন নামে। সকাল ৮টার দিকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা-শিববাড়ি সড়কে শ্রমিকরা সড়ক বন্ধ করে আন্দোলন করে পুলিশ ঘটনাস্থলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে নিলে যান চলাচল শুরু হয়।

এর কিছু সময় পর গাজীপুর মহানগরের বাসন থানা এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিক্ষোভ শুরু করে শ্রমিকরা। এসময় আন্দোলনরত শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে মহাসড়কে কাঠ, গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করলে পুলিশ টিয়ার শেল ছুঁড়ে তাদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। পরে জয়দেবপুর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান আহম্মেদ জানান, সকালে চান্দনা এলাকায় একটি কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করলে তাদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে এরপরই নাওজোর এলাকাসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা ভাঙচুর করে এবং সড়কে কাঠ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, সকালে নাওজোড় এলাকায় শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেছিল। পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছে। আমরা কোন অ্যাকশনে যেতে চাচ্ছি না শ্রমিকরাও চাচ্ছে না। আন্দোলনরত শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।




নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সামনে আন্দোলন করছেন শ্রমিকরা

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার দাবিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সামনে আন্দোলন করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।

মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) বেলা ১১টা থেকে রাজধানীর তোপখানা রোডে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে এই দাবি জানাচ্ছেন শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা।

এদিকে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ডের সভা কক্ষে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান। তাদের প্রস্তাবগুলোর যাচাই-বাছাইয়ের পর পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। এটি মজুরি বোর্ডের ৬ষ্ঠ সভা।

অন্যদিকে বৈঠকের মধ্যেই গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী ও এর আশপাশের বিভিন্ন কারখানার বেতন বাড়ানোর দাবিতে আবারও বিক্ষোভ করছেন শ্রমিকরা। বিক্ষোভকারী শ্রমিকরা দুটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ করেছে।

এর আগের সভায় মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রনি শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ২০ হাজার ৩৯৪ টাকার প্রস্তাব করেন। আর মজুরি বোর্ডে পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। উভয়পক্ষ প্রস্তাবনায় তাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে মজুরি বৃদ্ধি গার্মেন্টস আন্দোলনের নেতার বলছেন, পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করতে হবে। শ্রমিকদের গ্রেপ্তার-হত্যা-মামলা-ছাঁটাই-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্পরক্ষা জাতীয় মঞ্চের নেতারা বলছেন, অবিলম্বে মজুরি ২৩ হাজার টাকা ঘোষণা করতে হবে। দিতে হবে ৫টি গ্রেড এবং ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট। একই দাবি জানিয়েছে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ।

এছাড়াও কলকারখানা খুলে দেওয়া, সুষ্ঠু, সুন্দর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, কলকারখানায় মাস্তান পোষা বন্ধ করা, শ্রমিকদের সঙ্গে শোভন আচরণ করা এবং শ্রমিক হত্যার বিচার করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এবং জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।




মজুরি বোর্ড ঘোষণা নভেম্বরে কার্যকর ডিসেম্বরে: বিজিএমইএ সভাপতি

ডিসেম্বর মাসে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেছেন, ‘ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত আসবে নভেম্বরেই এবং তা ডিসেম্বরেই কার্যকর করা হবে।’

ফারুক হাসান বলেন, ‘শ্রমিকদের কষ্ট হচ্ছে আমরা জানি। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখন সংকটে আছে। আমাদের পোশাক রপ্তানি কমে গেছে। এ অবস্থায় আমরাও খুব একটা ভালো নেই।’

মঙ্গলবার বিজিএমইএ প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ফারুক হাসান এসব কথা বলেন।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি একটি কঠিন সময় পার করছে। এর চেয়ে কঠিন অবস্থায় আছে দেশের পোশাক শিল্প। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি কমেছে বিশ্বব্যাপী ২৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ থেকে তাদের আমদানি কমেছে ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আমদানি কমিয়েছে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কমেছে ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী আমদানি কমেছে ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং বাংলাদেশের কমেছে ১৫ দশমিক ০৭ শতাংশ।’

সার্বিকভাবে দেশের পোশাক রপ্তানি ২২ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে জানিয়ে ফারুক হাসান বলেন, ‘পোশাক শিল্প মালিকরা যদি মনে করেন তাদের শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কারখানার নিরাপত্তা এবং সম্পদ রক্ষায় শ্রম আইনের ১৩/১ ধারায় কারখানা বিনা নোটিসে বন্ধ করতে পারবে, এর জন্য কোনো বেতন দিতে হবে না মালিকদের। এছাড়া আসছে নভেম্বর মাসে যে ঘোষণা মজুরি বোর্ড দেবে তা বিজিএমইএ মেনে নিয়ে ডিসেম্বরেই বেতন দেওয়া হবে।’ বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘দেশের পোশাক শিল্প এখন খুব ভালো অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টায় এবং রাস্তায় আছে। কিন্তু এমন সময়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন তা অনভিপ্রেত। এই সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতির চাপে পুরো দেশ এবং অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এখন আন্দোলনের কারণে পোশাক কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক ভাইয়েরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন, যা আমরা চাই না।’

বক্তব্যের শুরুতে মৃত শ্রমিকদের প্রতি মাগফিরাত এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান বিজিএমইএ সভাপতি। পাশাপাশি পোশাক মালিকদের ক্ষতিতে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।