‘ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন রোডম্যাপ কাজে আসবে না’

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। তবে এর আগেও এরকম রোডম্যাপ ছিলো। আগের রোডম্যাপ থেকে কেনো সরে আসলাম, তা না জেনে নতুন রোডম্যাপ করে কোনো কাজে আসবে না বলে জানিয়েছেন তত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব কথা বলেন।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ব্যাংক খাত অর্থনীতির হৃদপিণ্ডের মতো কাজ করে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। তবে এর আগেও এরকম রোডম্যাপ ছিলো। আগের রোডম্যাপ থেকে কেনো সরে আসলাম, তা না জেনে নতুন রোডম্যাপ করে কোনো লাভ হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে আর্থিক খাতের অবস্থা ভালো নেই। পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক লেনদেনের তথ্য আরও ডিসক্লোজার হওয়া দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধানগুলো খুবই জরুরি। এসব বিধিবিধানে অনেক সংশোধন হয়েছে। এগুলোর ইতিহাস জানা খুবই জরুরী। স্পন্সর ডিরেক্টরেরা অনেক শক্তিশালী হয়। স্পন্সর ডিরেক্টর কী পরিমাণ ঋণ নিতে পারবে, এক পরিবার থেকে কতজন পরিচালক থাকবে এবং তাদের মেয়াদে কত বছর হবে সে সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ এসব বিষয়ে বিস্তারিত না জানলে বোঝা যাবে না বলেও জানান এ অর্থনীতিবিদ।

এছাড়াও তিনি বলেন, প্রথম ব্যাংক রিফর্ম কমিটি গঠন করা হয় ১৯৯৭ সালে। তখন ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে একটি মিটিং করেছিলাম। সেই সময় তাঁরা নিজেদের ব্যাংক থেকে ৩০ শতাংশের বেশি ঋণ নিয়েছিলো। এসব ঋণের অধিকাংশ ছিলো খেলাপি। তখন এসব ব্যাংক মালিকেরা বলেছিলো- ‘অনেক কষ্ট করে ও অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক চালু করেছি, এখন আমরা ঋণ নিতেও পারবো না। কষ্ট করেছি তাই ঋণ নিচ্ছি আমরা।’ তবে সেখান থেকে ব্যাংক খাত বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এখন ৩ শতাংশ ঋণ নিতে পারছে ব্যাংক মালিকেরা। তাও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে ৩ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমানে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে মার্জ করে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর দায় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক নেবে না। যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটি সম্ভব হতে পারে। কয়েকটি কেলেঙ্কারি হওয়া বড় ব্যাংকে আমানতে ভাটা পড়েনি। কারণ কোনো ব্যাংকে বড় ধরনের কেলঙ্কারি হলে সেদিকে আমানতকারীরা খেয়াল রাখে না। তবে যেসব ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না, তাদের দরকার নেই।

একই অনুষ্ঠানে সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে আগে ঋণ অবলোপন করা হতো তিন বছরে। এখন সময় আরও কমিয়ে দুই বছর করা হয়েছে। সুযোগ থাকলে ৬ মাসের মধ্যে ঋণ অবলোপন করে ফেলবে। কারণ অবলোপন করলে ব্যালেন্স শিট থেকে ৪৩ হাজার কোটি টাকা বের হয়ে যাবে। তখন ব্যালেন্স শিট দেখতে একটু ভালো দেখাবে। এজন্য এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকও এর অধীনে। দেশের নতুন ব্যাংকগুলো যদি সৃজনশীল কাজ করে তাহলে ভালো। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। আর যদি শুধু ঢাকায় শাখা খুলে বসে থাকে, সেরকম ব্যাংক দরকার নেই।

এছাড়াও তিনি বলেন, তথ্য-উপাত্তে অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। ইপিবির তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশ করা রপ্তানির তথ্যে মিল থাকে না। আবর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ এক, অপরদিকে আইএমএফের হিসাবে রিজার্ভ আরও কম। এত বিভ্রাট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যতে।




ধার করে চলছে অনেক ব্যাংক

ডলার সংকটের এ সময়ে টাকার টানাটানিতে পড়েছে ব্যাংক খাত। সংকট কাটাতে নিয়মিত ধার করে চলছে অনেক ব্যাংক। এত ধারের পরও এক সময় ভালো অবস্থানে থাকা কয়েকটি ব্যাংক এখন নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর) রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সপ্তাহের প্রথম দিন কয়েকটি ব্যাংক ২০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ধার করেছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেয় ১৪ হাজার ১৫ কোটি টাকা। কলমানিসহ আন্তঃব্যাংক থেকে নেওয়া হয় ৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। আন্তঃব্যাংক লেনদেনে সুদহার বেড়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে ওঠে। এর আগের রোববার ব্যাংকগুলোর ধারের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেয় ১৫ হাজার ৭৪৬ কোটি এবং আন্তঃব্যাংক থেকে ৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা নেওয়া হয়। ওই দিন সর্বোচ্চ সুদ ছিল ৯ শতাংশ। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ধার করছে ব্যাংকগুলো। এরপরও শরিয়াহভিত্তিক ৫টিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক অনেক দিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সিআরআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব ব্যাংকের ওপর আরোপ করা দণ্ডসুদ পরিশোধের মতো অবস্থাও নেই। যে কারণে দণ্ডসুদ পরিশোধে সময় নিয়েছে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইএমএফের পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রেপো নিতে গুনতে হচ্ছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদ। স্পেশাল রেপোতে তা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর প্রভাবে ব্যাংকের ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার বাড়বে। এর সঙ্গে এখন গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার নির্ধারণ করতে যোগ করা হবে তিন শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে তিন শতাংশ। এতে সুদহার যে আরও বাড়বে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে এমনিতেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে আগস্ট শেষে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে। বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ সরাসরি কমেছে। ফলে সাধারণভাবে তহবিল চাহিদা কমার কথা। তবে কয়েকটি ব্যাংকের বিতরণ করা বিপুল অঙ্কের বেনামি ও ভুয়া ঋণ আর আদায় হচ্ছে না। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন নীতিসহায়তার কারণে পুরো ঋণ ফেরত না দিলেও খেলাপি হচ্ছে না। এতে করে অর্থপ্রবাহ কমে তারল্য সংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো।

ব্যাংকাররা জানান, বিভিন্ন কারণে একদিকে অর্থ প্রবাহ কমেছে, অন্যদিকে নানা উপায়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পরও বিদেশি উৎস থেকে যে পরিমাণ অর্থ আসছে খরচ হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। আবার বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ ঋণ আসছে পরিশোধ করতে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল অঙ্কের ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। ডলারের বিপরীতে বাজার থেকে টাকা উঠে আসছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে উঠে এসেছে ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত অর্থবছর বিক্রি করা হয় ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাজার থেকে উঠে আসে ২ লাখ কোটি টাকার মতো। এভাবে ডলার বিক্রির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এখন ২১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ রিজার্ভ উঠেছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ওপরে।




এসআইবিএলকে বোনাস লভ্যাংশ প্রদানে বিএসইসির সম্মতি

পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) ঘোষিত বোনাস লভ্যাংশ প্রদানের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বুধবার (২৪ মে) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই-সিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

তথ্য মতে, ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, বিএসইসির অনুমোদন ছাড়া কোনও কোম্পানি বোনাস লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে না। তাই বোনাস শেয়ার ঘোষণার পর তা প্রদানের লক্ষ্যে কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সম্মতির জন্য আবেদন করে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডকে বোনাস লভ্যাংশ প্রদানের সম্মতি দিয়েছে।

বোনাস লভ্যাংশ বিতরণে কোম্পানিটির রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করেছে ৫ জুন।




৪ ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ

পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতে তালিকাভুক্ত ৪ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৩) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বুধবার (১০ মে) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই-সিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ব্যাংক ৪টি হলো- সিটি ব্যাংক লিমিটেড, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড, যমুনা ব্যাংক লিমিটেড ও এক্সিম ব্যাংক লিমিটেড।

সিটি ব্যাংক: কোম্পানিটির চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ০.৭৪ টাকা। এর আগের হিসাব বছরে একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ০.৭৪ টাকা। আর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৮.৮৪ টাকায়।

ইস্টার্ন ব্যাংক: কোম্পানিটির চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা। এর আগের হিসাব বছরে একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ১.১১ টাকা। আর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩৪.২৯ টাকায়।

যমুনা ব্যাংক: কোম্পানিটির চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১.৭৮ টাকা। এর আগের হিসাব বছরে একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ১.৭২ টাকা। আর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২৭.৫৬ টাকায়।

এক্সিম ব্যাংক: কোম্পানিটির চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিক সমন্বিত শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ০.১৪ টাকা। এর আগের হিসাব বছরে একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ০.২৫ টাকা। আর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ২২.১৩ টাকায়।