পুঁজিবাজার নিয়ে সব সময় ভয়ে থাকতে হয়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। এজন্য পুঁজিবাজার নিয়ে সবসময় ভয়ে থাকতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইস‌ি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।

গতকাল রোববার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) ও সেন্ট্রাল কাউন্টার প‌ার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিব‌িএল) যৌথ উদ্য‌োগে আয়োজিত “‘প্রতারণা ও জালিয়াতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য‌ে একথা বলেছেন।

বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম তার বক্তব্য‌ে বলেন, আমাদের দেশে এখনো এক শতাংশের বেশি লোক পুঁজিবাজার বোঝে না। সিদ্ধান্ত নেয় এমন কিছু লোকও বোঝে না। এটা একটা দেশের বিরাট সমস্যা। আমরা দেশের বিনিয়োগকারীদের আর্থিক স্বাক্ষরতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছি। অন্যদিকে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দূর করতে ও দেশের ব্র্যান্ডিং করতে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোড শো করছি। এ মাসের শেষের দিকে আমরা ফ্রান্স ও জার্মানিতে রোড শো করব। এক সময় আমাদের অর্থমন্ত্রীরা ফ্রান্স এইড ক্লাবে অনুদানের জন্য যেত। আর এখন আমরা সেখানে যাচ্ছি ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজতে। এটা এক নতুন বাংলাদেশ।

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অনেক কাজ করলেও গুজব ও ভুয়া তথ্যের কারণে সেটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে শিবলী রুবাইয়াত বলেন, এত কাজ করার পরেও পুঁজিবাজার নিয়ে ভয়ে থাকি যে কালকে বাজারে কী হবে? এর কারণ হচ্ছে কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুঁজিবাজার নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। এখানে আতঙ্ক ছড়ানো হলে সেটি বড় প্রভাব ফেলে। সাম‌াজিক যোগাযোগ মধ্যেমে ভিউ বেশি হলে অর্থ পাওয়া যায়। এ অর্থের লোভে ভুয়া তথ্য দিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। আমরা যত যাই করি এসব ভুয়া তথ্য বন্ধ করত‌ে না পারলে পুঁজিবাজার এগোতে পারবে না। আমরা প্রতিনিয়ত যারা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আপনাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এটি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় সে ব্যবস্থা নেবেন।

স্বাগত বক্তব্যে সেন্ট্রাল ডিপোজিটর‌ি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুল মোতালেব বলেন, সিডিবিএলের বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড স‌ার্ভিস রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন।

সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) এমডি ও সিইও ফরহাদ আহমেদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও জালিয়াতি থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অসমর্থিত যেকোনো মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জ ও কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে প্রকৃত তথ্য যাচাই-বাছাই করত‌ে হবে।

মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের এমডি ও সিইও মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আপনার সম্পদের সুরক্ষা আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য ভালো শেয়ার বেছে নিতে হবে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই), সম্পদের তুলনায় মুনাফার পরিমাণ ও কোম্পানি ব্যবসা প্রবৃদ্ধি কেমন এ ধরনের কিছু নির্দেশক পর্যালোচনা কর‌ার মাধ্যমে বিনিয়োগের জন্য ভালো শেয়ার নির্বাচন করা সম্ভব।

সিসিবিএলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (এলপিআর) মো. ওয়াহিদ উজ জামান বলেন, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তার জন্য বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আমাদের এখানেও তাই। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সিসিবিএল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতে সিসিপি প্রতিষ্ঠার পর পুঁজিবাজারে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কাঠামোগত পরিবর্তন‌ে সিসিবিএল কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।

সিডিবিএলের চেয়ারম্যান শেখ কবীর হোসেন বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় এবারো আমরা বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উদযাপন করছি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। বড় বিনিয়োগকারীরা সবসময় ছোট বিনিয়োগকারীদের ঠকাতে চাইবেই। অন্যদিকে ছোট বিনিয়োগকারীরা জ্ঞানের অভাবে ঠকে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় নিরীক্ষার মান ও নিরীক্ষকের বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। নিরীক্ষকরা যাতে যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমি বিএসইসিকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সিডিবিএলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিসিবিএলের পরিচালক একেএম নুরুল ফজল বুলবুল।

 




প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ভালো করছে মিউচুয়াল ফান্ড

মিউচুয়াল ফান্ডের আয়ের প্রধান উৎস পুঁজিবাজার। কিন্তু সেই পুঁজিবাজার মন্দার মধ্যে রয়েছে। প্রধান মূল্য সূচকের পাশাপাশি ব্লু-চিপস কোম্পানির সূচকও কমেছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদানও কমেছে। এতসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও মিউচুয়াল ফান্ড খাত সর্বশেষ অর্থবছরের ব্যবসায় ভালো লভ্যাংশ দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ’ উপলক্ষ্যে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস (এএএমসিএমএফ) আয়োজিত রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে ‘রোল অব এসডিজি অ্যানালিটিক্স ইন ক্যাপিটাল মার্কেট-বেজড ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্সিং’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার ড. মিজানুর রহমান। এতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন আরেক কমিশনার ড. শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রেস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এএএমসিএমএফ এর সভাপতি ড. হাসান ইমাম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের কোঅর্ডিনেটর অ্যান্ড ইকোনোমিস্ট জুবায়ের হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার ড. মিজানুর রহমান বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে শেয়ারবাজারে এই খাতের অংশগ্রহণ খুবই কম। যেটা ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু এটা হওয়া উচিত ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। তবে আগামী ১০ বছরে এই খাত অনেক এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া হিসাব মান পরিপালনে কঠোর কমিশন। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে কমিশনার ড. শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নিরসন করে। যা ব্যক্তিগতভাবে করা কঠিন। এজন্য বিনিয়োগকারীদের মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানাই।

রেস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এএএমসিএমএফ এর সভপাতি ড. হাসান ইমাম বলেন, মিউচুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। এই খাতটি অনেক বাঁধা বা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ভালো করছে। শেয়ারবাজার যেখানে নেতিবাচক, সেখানে এই খাতের উন্নতি হয়েছে।

তিনি বলেন, গত অর্থবছরে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক ছিল। যেই ব্লু চিপস কোম্পানিতে মিউচুয়াল ফান্ড থেকে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা হয়, সেই ব্লু চিপস-৩০ সূচকও নেতিবাচক ছিল। এই অবস্থার মধ্যেও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ২০২২-২৩ অর্থবছরের ব্যবসায় ২৮৩ কোটি টাকার নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এমনকি গত ১০ বছরের মধ্যে ৭ বছরই সূচক বৃদ্ধির তুলনায় মিউচুয়াল ফান্ড ভালো করেছে।

মিউচুয়াল ফান্ডের দাম কম নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেন উল্লেখ করে হাসান ইমাম বলেন, এই যে কোনো কোনো ইউনিটের দর ৪-৫ টাকা, এটা কিন্তু অ্যাসেট ম্যানেজারদের পারফরমেন্স না। আপনাকে দেখতে হবে ওই ইউনিটের অ্যাসেট কত আছে। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে সম্পদের তুলনায় অনেক কমে বা ডিসকাউন্টে ইউনিট লেনদেন হয়। যেটা আমেরিকায় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেজাউল করিম বলেন, বন্ডের কুপন রেট থেকে কর অব্যাহতি দেওয়া দরকার। তাহলে ইউনিটহোল্ডাররা ভালো লভ্যাংশ পাবে।

এলআর গ্লোবালের সিআইও রিয়াজ ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়েছে, সেভাবে শেয়ারবাজার এগোয়নি। এটা শেয়ারবাজারের জন্য খারাপ খবর। এটা সমাধান করা সম্ভব। যার অনেক সুযোগ রয়েছে।