চারদিন পর বাড়লো ডলারের দাম

টানা চারদিন কমার পর দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ফের ডলারের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) একদিনে ডলারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৪০ পয়সা। ফলে প্রতি ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রার গড় দাম বেড়ে ১২১ টাকা ১১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ দাম ১২১ টাকা ৫০ পয়সা এবং সর্বনিম্ন দাম ১২০ টাকা ৮০ পয়সা। প্রতি ডলারের গড় দাম ১২১ টাকা ১১ পয়সা।

গতকাল সোমবার পর্যন্ত আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে এ দাম ছিল যথাক্রমে ১২০ টাকা ১০ পয়সা ও ১১৯ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ একদিনে ডলারের গড় দাম ১ টাকা ৪০ পয়সা বেড়েছে।

ডলারের এ দাম বাড়ার বিষয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েকদিনে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ বাড়ার কারণে ডলারের দাম কম ছিল। একই সঙ্গে আমদানি হ্রাস ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার গতি কমায় ডলারের চাহিদাও কমে গিয়েছিল।

এছাড়া গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে। এতে বাজারে সংকেত গেছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দরপতন ঠেকাতে সক্রিয় হয়েছে, যা দাম বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের দাম দীর্ঘদিন ধরে চড়া থাকায় দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে, যা জনগণের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে ডলারের দাম একবার কমে গেলে তা ধরে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে প্রবাসী আয়ের গতি ইতিবাচক, রপ্তানি আয়ও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। তাছাড়া আমদানি ও এলসি খোলার হার কমে গেছে। ডলার বিক্রির আগ্রহ বাড়ছে ব্যাংকগুলোর মধ্যে। সরবরাহ বেশি হলেও চাহিদা তুলনামূলক কম।

এ প্রেক্ষাপটে আগামী দিনগুলোতে ডলারের দাম কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাজারে যেন অস্থিরতা বা নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা হয়েছে। বর্তমানে যেসব ব্যাংক আমদানি দায় পরিশোধ করছে, তারা নিজেরাই এ পেমেন্ট দিচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায়, তাদের কাছে অতিরিক্ত ডলারের জোগান রয়েছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ভবিষ্যতেও প্রয়োজনে বাজার থেকে ডলার কিনতে পারে।




১৯ দিনে প্রবাসী আয় এলো ১২ হাজার কোটি টাকা

চলতি মে মাসে প্রতিদিন ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৩৩ হাজার ডলার বা ৬৪২ কোটি টাকার প্রবাসী আয় আসছে দেশে। এ মাসের ১৯ দিনে এসেছে ১১২ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি এক ডলার ১০৮ টাকা ধরে) যার পরিমাণ ১২ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

চলতি অর্থবছরের (২০২২-২০২৩) প্রথম মাস জুলাই ও দ্বিতীয় মাস আগস্টে টানা দুই বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল। যেটা দিয়ে ভারী হচ্ছিল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কিন্তু পরের মাস থেকেই কমতে থাকে রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ। টানা ছয় মাস কেটে গেলেও দুই বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে পৌঁছাতে পারেনি। তবে অর্থবছরের নবম মাস মার্চে এসে আবারও দুই বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে।

একই ধারাবাহিকতায় আসতে থাকে এপ্রিলের শুরুর দিক। তবে মাসের (এপ্রিল) শেষ দিকে আশা জাগিয়েও পড়ে যায় প্রবাহ। পুরো এপ্রিল মাসে আসে ১৬৮ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঈদের আগে বেশি এলেও ঈদের পরে কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আবারও বাড়বে প্রবাসী আয় আসার প্রবাহ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি মাসের (মে) ১৯ দিনে মোট ১১২ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যো রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৮ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে একটির মাধ্যমে এসেছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৯০ হাজার ডলার। বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৯০ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ডলার।

তবে আলোচিত সময়ে ৯ ব্যাংকের মাধ্যমে কোনো প্রবাসী আয় দেশে আসেনি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা বিডিবিএল, বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) টানা দুই বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে টানা ছয় মাস দেড় বিলিয়ন ডলারের ঘরেই থেমে যায় রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) এসেছিল ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, আগস্টে এসেছিল ২০৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে এসেছিল ১৫৩ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার, অক্টোবরে ১৫২ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, নভেম্বরে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, ডিসেম্বরে প্রায় ১৭০ কোটি ডলার বা ১৬৯ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার।

জানুয়ারি মাসে এসেছে ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার, ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ১৫৬ কোটি ১২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। আর স্বাধীনতার মাস মার্চ মাসে এসেছে ২০১ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আর সদ্যবিদায়ী মাস এপ্রিলের পুরো সময়ে ১৬৮ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার এসেছে দেশে। আশা করা হচ্ছিল ঈদুল ফিতরের মাস এপ্রিলে দুই বিলিয়নের ঘর অতিক্রম করবে। যেহেতু ঈদুল ফিতর পড়েছিল সে হিসাবে এপ্রিলে ভালো রেমিট্যান্সের আশা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাসটির শুরুতে সেভাবেই আসছিল রেমিট্যান্স। তবে সে আশা ফিকে করে মাসটিতে আসে ১৬৮ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স।

এর আগে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে মোট ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ (২১.০৩ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। এটি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ কম। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ (২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।