পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলল ভারত

প্রায় ৬ মাস পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখার পর অবশেষে তা তুলে নিল ভারত। শনিবার দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কেন্দ্রীয় সংস্থা ডিরেক্টোরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিশ্চিত করেছে এ তথ্য।

শনিবারের বিজ্ঞপ্তিতে প্রতি টন পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য (এমইপি) ৫৫০ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিজিএফটি।

ভারতের রাজনীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চলমান লোকসভা নির্বাচনের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন দল বিজেপি। গত বছর ডিসেম্বরে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের কারণে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের কৃষকরা ব্যাপক লোকসানের শিকার হন; ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ক্ষোভ রয়েছে তাদের। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে রাজ্যটির প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিজেপি প্রার্থীরা।

ভোটের ফলাফলে যেন কৃষকদের ক্ষোভের আঁচ না থাকে— সেজন্যই বিজেপি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে বলে ধারণা অনেক রাজনীতি বিশ্লেষকের।

প্রসঙ্গত, মহারাষ্ট্রকে বলা হয় ভারতের পেঁয়াজের রাজধানী। দেশটির মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের অধিকাংশই আসে এই রাজ্য থেকে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পর বাংলাদেশ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মরিশাসসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পেঁয়াজ রপ্তানি করে ভারত।

ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতিতেও পেঁয়াজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল, বিশেষ করে ভোটের বেলায়। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই নির্বাচনকে ‘পেঁয়াজের নির্বাচন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কংগ্রেসের সভানেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধজ্ঞা দিয়েছিল নয়াদিল্লিতে সে সময়ে আসীন কংগ্রেসবিরোধী সরকার।

নির্বাচনে জয়ের পর পেঁয়াজের ওপর থেকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় কংগ্রেস সরকার; এতে কৃষক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে রীতিমতো পেঁয়াজ রপ্তানির হিড়িক পড়ে যায় এবং বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। এক পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য ৬ রুপি পর্যন্ত উঠেছিল, যা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে রীতিমতো ‘রাজকীয় মূল্য’।

গত বছর ডিসেম্বরে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। প্রথম পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত হলেও পরে তা আরও বাড়ানো হয়। তার আগে ২০২৩ সালের আগস্টে পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছিল নয়াদিল্লি।




ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত 

পেঁয়াজ রপ্তানিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত। শনিবার কেন্দ্রীয় সরকার থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে গত বছর ডিসেম্বরে পেঁয়াজ রপ্তানিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল ৩১ মার্চ পর্যন্ত। শনিবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ আসার আগ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে রপ্তানি।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

ভারতের পেঁয়াজের খবর নেই, ঘাটতি থাকায় ভরা মৌসুমেও বাজার অস্থির
মুম্বাইভিত্তিক একটি পেঁয়াজ রপ্তানি সংস্থার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, ‘এই আদেশ হতবুদ্ধিকর এবং পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। এমনিতেই দেশের অভ্যন্তরে পেঁয়াজ এখন পানির দামে বিক্রি হচ্ছে, তার ওপর আর কিছুদিন পর নতুন ফসল আসবে। তখন কী হবে?’

ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রকে বলা হয় পেঁয়াজের রাজধানী। দেশটির পেঁয়াজের মোট চাহিদার বড় অংশই আসে এ রাজ্যটি থেকে।

রয়টার্সকে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের পাইকারি বাজারগুলোতে প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ রুপিতে। নিষেধাজ্ঞার পর থেকে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করে এবং বর্তমানে বাজারগুলোতে প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজের পাইকারি মূল্য নেমেছে ১ হাজার ২০০ রুপিতে।

রপ্তানিতে অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা আসায় সামনের দিনগুলোতে দাম আরও নেমে যাবে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজ রপ্তানিকারী দেশ। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, নেপাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতীয় পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশেও রপ্তানি হয় ভারতীয় পেঁয়াজ।

ডিসেম্বরে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দামে ধস নামলেও বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে হু হু করে। বাংলাদেশের বাজারে বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা দরে। কয়েক দিন আগে এই দর ১২০ টাকা ছুঁয়েছিল।

ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি সংক্রান্ত সরকারি সংস্থা হর্টিকালচার এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের (হেপা) প্রেসিডেন্ট অজিত শাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়। প্রতি বছরেই মার্চ-এপ্রিল মাসে (আন্তর্জাতিক) বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দেয়। এতদিন ভারতীয় পেঁয়াজ এই ঘাটতি সামাল দিতো। সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে এ বছরের তিন মাসে বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ পৌঁছায়নি, সেজন্যই এ ঘাটতি।’

‘তবে মে মাসে মিসর-তুরস্ক থেকে পেঁয়াজের চালান আসা শুরু হবে। সেসময় দামও স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে।’




পেঁয়াজ রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দিলো ভারত

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম ঠিক রাখতে রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের বাজারে। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি টন পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য ৮০০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে গত শনিবার এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি হয়েছে।

ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্ত ২৯ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি টন পেঁয়াজের দাম ৮০০ ডলার হলে কেজিপ্রতি এর রপ্তানি মূল্য পড়বে ৬৭ রুপি। দেশের ভেতরে কোন কোন বাজারে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৮০ রুপি পর্যন্ত উঠেছে। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

এ ছাড়া বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত দুই লাখ টন পেঁয়াজ কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে তারা আরও পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ কিনেছিল। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এ বছর তারা সাত লাখ টন পেঁয়াজ কিনছে।

এনডিটিভির সংবাদে বলা হয়েছে, শুধু বেঙ্গালুর রোজ ও কৃষ্ণপুরাম জাতের পেঁয়াজ ছাড়া সব ধরনের পেঁয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম মূল্য প্রযোজ্য হবে। আস্ত পেঁয়াজ, কাঁটা পেঁয়াজ, ভাঙা ও গুঁড়া সব ধরনের পেঁয়াজ রপ্তানিতেই এই ন্যূনতম মূল্য প্রযোজ্য হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো দেশেই যে কোনো পরিমাণে পেঁয়াজ রপ্তানি করা যাবে। এ বিষয়ে বাধা নেই। তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতি টন পেঁয়াজে ন্যূনতম ৮০০ ডলার নিতে হবে, এর নিচে নয়। জাহাজে পরিবহন ও বিমার খরচ এ দামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়।

রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার আগে যেসব পেঁয়াজ শুল্কায়নের জন্য বন্দরে আনা হয়েছে, সেই পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম মূল্য প্রযোজ্য হবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাজারে কোন প্রভাব পড়বে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বাড়লে তার প্রভাব তো দেশের বাজারে পড়তেই পারে। এ কারণে এখন থেকেই বিকল্প বাজার দেখা উচিত। সেভাবে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে।