নদী-খাল খননে দীর্ঘমেয়াদি পিপিপি মডেল চান ব্যবসায়ীরা

দেশের বিলুপ্ত ও ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-খাল পুনঃখননে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল, যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন খরচ কমানো এবং কৃষি খাতে পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

ঢাকা চেম্বারের মতে, পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নৌপথ সচল করা গেলে পণ্য পরিবহন খরচ ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

বুধবার (২৯ জুলাই) ডিসিসিআইয়ের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে এ দাবি তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

এ ছাড়া, সেমিনারে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মন, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর চারপাশের খালগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের রক্তনালীর মতো, যদিও দখল ও দূষণেল ফলে এগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার অনুযায়ী সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।তবে এ কর্মসূচির সুফল পেতে সারাদেশের খালগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, সরকার শুধুমাত্র খাল খননই করছে না, পরবর্তী সময়ে তা সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থার সমম্বয়ে কমিটি গঠন করেছে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খাল ও নদী খনন কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিসঞ্চারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, শিল্পের বর্জ্য যেন নদীতে না পড়ে সেদিকে সবাইকেই সজাগ থাকতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিল্প-কারখানায় যেন স্বল্প খরচে ইটিপি স্থাপন করা যায়, এ বিষয়ে প্রযুক্তি সহায়তার দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গবেষণা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তার কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্ত্রী মত প্রকাশ করেন।

মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার খালের নেটওয়ার্ক এবং ১ হাজার ৪১৫টি নদী থাকলেও গত কয়েক দশকের অবহেলা, দখল ও পলি জমার কারণে ৫৫ শতাংশের বেশি খাল বিলুপ্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে দেশের নৌপথ প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার সচল থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৫ কিলোমিটারে নেমে আসে। ফলে দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ৭৭ শতাংশই বর্তমানে সড়কপথ নির্ভর, যা পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মহাসড়কে তীব্র যানজট ও পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নৌপথে পণ্য পরিবহনে প্রতি টনে খরচ হয় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, যা সড়কপথের ১ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ঢাকার ১১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সার্কুলার ওয়াটারওয়ে কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী ঘেরা এই নৌপথের সঙ্গে মান্ডা, জিরানি ও কল্যাণপুরের মতো ভেতরের খালগুলোকে সচল করা গেলে ঢাকার ৩ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের যানজটজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

দেশে সাম্প্রতিক খাল খনন কর্মসূচির চিত্র তুলে ধরে প্রবন্ধে জানানো হয়, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং ৫২০টি বিলুপ্ত নদী ও হাজার হাজার খাল পুনঃখননের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। প্রথম ১৮০ দিনে ১ হাজার কিলোমিটার এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খননের পাশাপাশি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, দেশের প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে ৩১ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জিআইএস ম্যাপিং প্রকল্প চালু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। দিনাজপুরের সাহাপাড়া পাইলট প্রকল্পে বর্ষার পানি ধরে রেখে ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কম খরচে সেচ নিশ্চিত করার ফলে গভীর নলকূপের ডিজেল ও বিদ্যুৎ খরচ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমেছে। এতে ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছে, যা হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সির মতোই টেকসই নৌপথের সফল উদাহরণ।

নদী ও খাল খননে ২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দ্রুত পলি জমে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার মতো চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে স্বল্পমেয়াদি ড্রেজিংয়ের বদলে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি পারফরম্যান্সভিত্তিক পিপিপি চুক্তি চালু, জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৫ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি প্রণয়ন, কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি, খালের সংযোগস্থলে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং বেসরকারি খাতকে ড্রেজার বা যন্ত্রপাতির বিনিময়ে অংশীদারিত্ব নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।




পিপিপিতে ২ বস্ত্রকল চালু হচ্ছে, প্রক্রিয়াধীন আরও ২টি

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ২টি বস্ত্রকল পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে চালু হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় অনুমোদনের ছয় বছর পর পিপিপির আওতায় বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বস্ত্রকল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল্স করপোরেশন (বিটিএমসি)। প্রক্রিয়াধীন আরও ২টি।

পিপিপিতে যে দুইটি বস্ত্রকল চালু হচ্ছে সেগুলো হলো-চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডুতে অবস্থিত আর আর টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড এবং রাজশাহীতে অবস্থিত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল্স। শিগগিরই বস্ত্রকল দুটির পিপিপি পার্টনারের সঙ্গে সংস্থাটির চুক্তি হবে।

আর আর টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেডের পিপিপি পার্টনার হচ্ছে-প্রাণ কনসোর্টিয়াম এবং রাজশাহীতে অবস্থিত রাজশাহী টেক্সটাইল মিলসের পিপিপি পার্টনার হচ্ছে-চরকা টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড। এর মধ্যে আর আর টেক্সটাইল মিলসের বার্ষিক চুক্তি ফি হচ্ছে তিন কোটি ২২ লাখ টাকা এবং রাজশাহী টেক্সটাইল মিলসের বার্ষিক চুক্তি ফি এক কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বিটিএমসি সূত্রে জানা যায়, আর আর টেক্সটাইল মিলটি ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ও ১৯৬৫ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। মিলটির ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিটিএমসির ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন চালু ছিল। বর্তমানে মিলটির যন্ত্রপাতি অত্যন্ত পুরাতন ও জরাজীর্ণ হওয়ায় বন্ধ আছে। পিপিপির মাধ্যমে মিলটি চালু হলে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন গ্রীণ ফ্যাক্টরি স্থাপিত হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিটিএমসি।

সূত্র জানায়, উভয়মিলের ক্ষেত্রেই কারখানা সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। গ্রেস পিরিয়ড অতিক্রমের পর বাৎসরিক চুক্তি ফি কার্যকর হবে।

সূত্র জানায়, আর আর টেক্সটাইল মিলটি পিপিপির আওতায় চালুর জন্য ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে তাতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পিপিপি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি প্রস্তাব জমা পড়ে। দাখিলকৃত তিনটি প্রস্তাবই কারিগরিভাবে যোগ্য বলে অভিমত দেয় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পিইসি সর্বোচ্চ স্কোর অর্জনকারী দরদাতা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে-প্রাণ কনসোর্টিয়াম।

অন্যদিকে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলটিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মিলটি ১৯৭৫ সালে স্থাপন করা হয় এবং ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এটি চালু ছিল। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় এ মিলটিও পিপিপির ভিত্তিতে চালুর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পিপিপি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে মাত্র একটি প্রস্তাব জমা পড়ে। একমাত্র দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চরকা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের প্রস্তাবটি কারিগরিভাবে রেসপনসিভ বলে অনুমোদন দেয় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বন্ধকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত ১৬টি মিল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিটিএমসি। ইতঃপূর্বে দুটি মিল পিপিপির ভিত্তিতে বেসরকারি অংশীদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মিল দুটি হচ্ছে-ডেমরায় অবস্থিত আহমেদ বাওয়ানি টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড এবং টঙ্গীতে অবস্থিত কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড। এছাড়া বর্তমানে আরও দুটি মিল পিপিপির ভিত্তিতে চালুর প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মিল দুটি হচ্ছে-ফেনীর রানীর হাটে অবস্থিত দোস্ত টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড এবং মাগুরায় অবস্থিত মাগুরা টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেড।

সূত্র জানায়, তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মিল দুটি ২০১৯ সালে পিপিপি পার্টনারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু করোনাজনিত কারণে গ্রেস পিরিয়ডের সময়সীমা বাড়ানো হয়। মিল দুটির মধ্যে ডেমরায় অবস্থিত আহমেদ বাওয়ানি টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেডের মাসিক চুক্তি ফি হচ্ছে ৩০ লাখ টাকা এবং টঙ্গীতে অবস্থিত কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিল্স লিমিটেডের মাসিক ফি হচ্ছে ২০ লাখ টাকা।