বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নেদারল্যান্ডস ভিসা প্রত্যাখ্যান নিয়ে উদ্বেগ

নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তারা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির (টিএসি) ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানের সাইডলাইনে এ বৈঠক হয়েছে।

বৈঠকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পর্যালোচনা করেন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বিশেষভাবে সার্কুলার অর্থনীতি, বৈধ অভিবাসন এবং ব-দ্বীপ উন্নয়নে প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

খলিলুর রহমান নেদারল্যান্ডসে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং ভিসা আবেদন ক্রমবর্ধমান হারে প্রত্যাখ্যানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এ সমস্যার সমাধানে ডাচ সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশি অ্যাপোস্টিল নথিপত্র সংক্রান্ত বিষয়ও উত্থাপন করে এ-সংক্রান্ত ব্যবস্থা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। জবাবে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়গুলো সন্তোষজনকভাবে সমাধানের লক্ষ্যে সেগুলো পর্যালোচনা করার আশ্বাস দেন।




দ্বৈত কর ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডসের চুক্তি

বিদ্যমান দ্বৈত কর আরোপ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১২ মার্চ) অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে নেদারলান্ডসের পক্ষে সে দেশের মিনিস্টার ফর ট্যাক্স অ্যান্ড দ্যা ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এমএলএ ভ্যান রিজ এবং বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও নেদারল্যান্ডসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সোনজা কুইপ।

বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে দ্বৈত কর আরোপ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধ সংক্রান্ত চুক্তি প্রায় ৩০ বছর আগে ১৯৯৩ সালের ১৩ জুলাই সই হয়। ইতোমধ্যে দ্বৈত কর পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি যেমন ওইসিডি মডেল কিংবা ইউএন মডেলেও নানা পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশও স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাজুয়েশন পিরিয়ড অতিক্রম করছে। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সই করা দ্বৈত কর পরিহার সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর অসামঞ্জস্যতা দূর করতে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে চুক্তিগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ইতোপূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি সংশোধন করে নতুন চুক্তি সম্পাদন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।

অনুষ্ঠান থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিতে ৩৩টি আর্টিকেল রয়েছে। এর মধ্যে করের আওতা বিস্তৃত করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্টিকেলে পরিবর্তন আনা হয়েছে, একই সঙ্গে নতুন নতুন ক্ষেত্র থেকে কর আহরণের জন্য কিছু নতুন আর্টিকেল সংযোজন করা হয়েছে।

নতুন চুক্তিতে শুধু রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আর্টিকেল অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সার্ভিস তথা সেবার বিপরীতে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে কর আহরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

শেয়ার হস্তান্তর বাবদ অর্জিত মূলধনি মুনাফা বাংলাদেশে করযোগ্য হওয়ার শর্ত নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সোর্স দেশে অর্থাৎ বাংলাদেশে অর্জিত মূলধনি লাভ থেকে কর আহরণ করা সম্ভব হবে।

বিদ্যমান চুক্তির কোনো আর্টিকেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন কোনো আয়ের ক্ষেত্রে করদাতা যে দেশের নিবাসী সে দেশে কর আরোপ করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে নতুন চুক্তিতে এটি সংশোধন করা হয়েছে। এখন যে দেশে এমন আয় উদ্ভূত হবে, সে দেশে কর আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া, কর দাবি আদায়ে সহযোগিতার নিমিত্তে এই আর্টিকেলটি নতুন সংযোজন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চুক্তি সম্পাদনকারী উভয় রাষ্ট্র রাজস্ব আদায়ে একে অপরকে সহযোগিতা করবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক অত্যন্ত উন্নত। বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের ১৫টি সহযোগী দেশের মধ্যে অন্যতম। নেদারল্যান্ডস ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের নবম রপ্তানিকারক বৃহত্তর অংশীদারি দেশ যার রপ্তানিমূল্য ২ হাজার মিলিয়ন ইউএস ডলারের অধিক।

বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ডসে রপ্তানিকৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে— নিটওয়্যার, ওভেন, গার্মেন্টস, গলদা চিংড়ি, জুতা, বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য, বাইসাইকেল ইত্যাদি।

ভারতের পেঁয়াজের খবর নেই, ঘাটতি থাকায় ভরা মৌসুমেও বাজার অস্থির
অপরদিকে বাংলাদেশ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে নেদারল্যান্ডস থেকে ৩০০ মিলিয়নের অধিক পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে ক্যাপিটাল মেশিনারি, শাক-সবজি, তৈরি খাদ্য উপাদান, জীবিত প্রাণি (পশু ও পাখি), খনিজ দ্রব্যাদি, কেমিক্যালস, ঔষধ সামগ্রী, অর্গানিক কেমিক্যালস, প্লাস্টিক, রাবার ইত্যাদি।

বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের স্থান চতুর্থ। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশে ২ হাজার ৫৬০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। জ্বালানি, বাণিজ্য, চামড়া খাত, চামড়াজাত পণ্য, সিমেন্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের বিনিয়োগ ক্রমশ বাড়ছে।




নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ

নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন এবং মিয়ানমারে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ডাচদের সমর্থনেরও অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ডাচ সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে পানি সংক্রান্ত খাত ছাড়াও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা আরও দৃঢ় করতে চায়। নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে চলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া শুক্রবার (৩১ মার্চ) ডাচ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূত জিওফ্রে ভ্যান লিউয়েনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রদূত লিউয়েন এসময় বলেন, ডাচ সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পানি সংক্রান্ত খাত ছাড়াও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা আরও দৃঢ় করতে প্রস্তুত।

 

সভায় মুখ্য সচিবের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। মুখ্য সচিব উদার সমাজ বিনির্মাণে নারীদের অগ্রগতি এবং বাংলাদেশে কার্যকরী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার সম্পর্কে ডাচ পক্ষকে অবহিত করেন। এছাড়া, রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন এবং মিয়ানমারে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ডাচদের সমর্থনেরও অনুরোধ করেন।

ডাচ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা লিউয়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের অব্যাহত যাত্রার প্রশংসা করেন এবং নেদারল্যান্ড সফরে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করেন। সভায় মুখ্য সচিব বাংলাদেশের সঙ্গে নেদারল্যান্ডের একটি পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ মেকানিজম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন যা ডাচ পক্ষ স্বাগত জানায়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, মেট্রোপলিটন চেম্বারের (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির এবং মহাসচিব ফারুক আহমেদ নিয়ে গঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

দিনব্যাপী বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলটি ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক করে। সেখানে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতি ইইউ-জিএসপি সুবিধার সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে রূপান্তরমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করে। বদ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ) বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কৃষির বিভিন্ন খাতে, ডাচ বিনিয়োগে অর্থায়ন সহজতর করতেও আলোচনা হয়।