ডলার রেট বাজারভিত্তিক করার ঘোষণা দিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাজার স্থিতিশীল দা‌বি ক‌রে ডলারের বিনিময় হার (ডলার-টাকার মূল্য) বাজারভিত্তিক করার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

বুধবার (১৪ মে) বাংলা‌দেশ ব্যাংকের এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি অংশ নি‌য়ে এ ঘোষণা দেন তি‌নি। এসময় তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে আগামী জুন নাগাদ কি‌স্তির ১৩৩ কে‌টি ডলার দেবে।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, গত ৯ মাসে রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বি‌ক্রি ক‌রা হয়‌নি। তারপরও বিনিময় হার গত কয়েক মাস স্থি‌তি‌শীল অবস্থায় আছে কো‌নো হস্ত‌ক্ষেপ ছাড়াই। এমন প‌রি‌স্থি‌তিতে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হ‌য়ে‌ছে। ব্যাংকারদের বিষয়‌টি বলা হ‌য়ে‌ছে।

বাজারভি‌ত্তিক করায় হঠাৎ রেট অনেক বে‌শি বেড়ে যাবে না জা‌নিয়ে গভর্নর বলেন, ডলার রেট অনেক দিন এক জায়গায় অর্থাৎ ১২২ টাকায় আছে। তার আশেপাশেই থাকবে। হঠাৎ ক‌রে ১৪০-১৫০ হবে এটার যুক্তি নেই। বাংলাদেশের ডলার রেট এদেশের নিয়ম অনুযায়ী ঠিক হবে, অন্যদেশের কথায় এখানে ডলার রেট ঠিক হবে না। বাজারে ডলারের যথেষ্ট সরবরাহ আছে।

কেউ কেউ বাজার অস্থি‌তি‌শীল করার চেষ্টা করবে এমন শঙ্কা ক‌রে গভর্নর জানান, কিছু সিন্ডিকেট কোম্পা‌নি আছে যারা বাজার অস্থি‌তি‌শীল করার চেষ্টা কর‌বে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স‌চেতন থাক‌বে এবং সার্বক্ষণিক তদার‌কি করা হ‌বে। য‌দি কেউ অ‌নৈ‌তিক উপায়ে অ‌স্থি‌তিশীল করার চেষ্টা ক‌রে তা‌দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হ‌বে।

সংবাদ সম্মেলনে উপ‌স্থিত ছি‌লেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. মো. হাবিবুর রহমান ও ক‌বির আহ‌মেদ, বাংলা‌দেশ ব্যাংকের উপ‌দেষ্টা আহসান উল্লাহ এবং নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রমুখ।

এদিকে আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে আগামী জু‌নের ম‌ধ্যে বাংলা‌দেশ সা‌ড়ে তিন বি‌লিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।




বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল

ডলারের দাম বাড়ায় বেশি বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। একইসঙ্গে যোগ হয়েছে দাতা সংস্থার ঋণ ও অনুদান। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

রোববার (২৯ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা এ তথ‌্য নি‌শ্চিত করেছেন। তিনি ঢাকা পো‌স্টকে বলেন, বিদেশি অনুদান যোগ হয়েছে। এ ছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো, এসব কারণে রিজার্ভ বেড়েছে।

অবশ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নিয়ম মেনে বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ-এর পরিমাণ এখন ২১.৩৩ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবেও আগের চেয়ে বেড়েছে রিজার্ভ।

নিট রিজার্ভ গণনা করা হয় আইএমএফের ‘বিপিএম-৬’ পরিমাপ অনুসারে। মোট রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বিয়োগ করলে নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ পাওয়া যায়।

তবে এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের আরেকটি হিসাব রয়েছে, তা হলো ব্যয়যোগ্য রিজার্ভ। এ তথ‌্য আনুষ্ঠা‌নিকভাবে খুব একটা প্রকাশ করে না কেন্দ্রীয় ব‌্যাংক। সেখানে আইএমএফের এসডিআর খাতে থাকা ডলার, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাবে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা এবং আকুর বিল বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের হিসাব করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেই হিসাবে দেশের ব্যয়যোগ্য প্রকৃত রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে ৫ বিলিয়ন ডলার হিসেবে এ রিজার্ভ দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। সাধারণত একটি দেশের ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি খরচের সমান রিজার্ভ থাকতে হয়।

চলতি মাসের প্রথম ২৮ দিনে দেশে বৈধ পথে ২৪২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপ‌রিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৯ হাজার ৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২০ টাকা ধরে)। দৈনিক গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল ছিল। বিশেষ করে ডলারের দাম ১২০ টাকায় ছিল দীর্ঘদিন ধরে। তবে গত সপ্তাহে ডলারের চা‌হিদা বাড়ায় দাম কিছুটা বেড়ে যায়। যার কারণে রে‌মিট‌্যান্স প্রবাহও বেড়েছে। যা রিজার্ভ বাড়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।




১০ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে জরিমানা

ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে ডলার বেচাকেনা করায় দেশের বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জরিমানার মুখে পড়া ব্যাংকগুলো হলো—ব্র্যাক, ট্রাস্ট, মার্কেন্টাইল, মধুমতি, মিডল্যান্ড, প্রিমিয়ার, আল-আরাফাহ ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, শাহজালাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

 

ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর ১০৯(৭) ধারা অনুযায়ী এ জরিমানা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জরিমানার শিকার হওয়া ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর আগে এসব ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শনে ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে ডলার বেচাকেনার প্রমাণ পাওয়া যায় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো চিঠিতে ট্রেজারি প্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে জরিমানা করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চিঠিতে ট্রেজারি প্রধানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। আমরা ধরে নিচ্ছি, ট্রেজারি প্রধানের পদটিকে জরিমানা করা হয়েছে। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা জরিমানা বা শাস্তির মুখে পড়লে তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যে ধারার অধীনে ১০ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে জরিমানা করা হয়েছে, সেটিতে বলা হয়, ‘যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশ বা আরোপিত কোনো শর্ত বা প্রণীত কোনো বিধি লঙ্ঘন করেন, তাহা হইলে তাহার উপর উক্ত লঙ্ঘনের জন্য অন্যূন ২০ হাজার টাকা এবং অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা আরোপিত হইবে। যদি অনুরূপ লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তাহা হইলে অনুরূপ লঙ্ঘনের প্রথম দিনের পর প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত অন্যূন ১ হাজার টাকা জরিমানা যুক্ত হবে।’




৪১ মাসের সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স সেপ্টেম্বরে

ডলারের বিনিময় হার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জোরালো তৎপরতার মধ্যেই দুঃসংবাদ হয়ে এল রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। সেপ্টেম্বরে মাত্র ১৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে কভিডসৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যে ১০৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গতকাল রেমিট্যান্সের এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

গত আড়াই বছরে ২৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ বাংলাদেশী শ্রমিক অভিবাসী হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ায় দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার কথা। কিন্তু চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস থেকেই রেমিট্যান্সে নিম্নমুখী প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৯১ কোটি ৬২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে ৫৬৭ কোটি ২৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহে এ ধারাবাহিক বিপর্যয় এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দেশে ডলারের তীব্র সংকট চলছে। আমদানি ১৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনা সত্ত্বেও বেশির ভাগ ব্যাংক যথাসময়ে ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জ্বালানি তেল, সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য রিজার্ভ থেকে ডলার সহায়তা দিতে হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষয় হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘রেমিট্যান্স পতনের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আছে। কেন এত পরিমাণ রেমিট্যান্স কমছে, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বলা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময়ই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার শুরুটা গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে। ওই সময় আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় হার বেঁধে দেয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বেশি দামে ডলার বেচাকেনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দেশী-বিদেশী ছয়টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণও করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব তৎপরতার মুখেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক ধাক্কায় রেমিট্যান্স ৫০ কোটি ডলার কমে যায়। ২০২২ সালের আগস্টে ২০৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে এলেও সেপ্টেম্বরে তা ১৫৩ কোটি ডলারে নেমে আসে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখনই ডলারের বিনিময় হার নিয়ে কঠোর হয়েছে, তখনই বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিপর্যয় দেখা গেছে।

বর্তমানেও বেশি দামে ডলার বেচাকেনা ঠেকাতে দেশের ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে ১০টি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান বিশেষ অভিযানের মধ্যেই রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেছেন, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভুল নীতিতে চলছে। বাস্তবতা না বুঝেই বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ব্যাংক নির্বাহীরা নির্ভয়ে কোনো পরামর্শও দিতে পারছে না। এ কারণে রেমিট্যান্সের বাজার এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘দেশে হুন্ডির বাজার এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরাও অনেক প্রভাবশালী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো প্রভাবশালী হুন্ডি কারবারিদের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না। তারা ভাসমান বিদেশী মুদ্রা বিক্রেতা ও কিছু মানি এক্সচেঞ্জে অভিযান চালিয়ে হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এ ধরনের লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।’

ব্যাংক খাতে গতকাল প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) প্রতি ডলার ১১৭-১১৮ টাকায় লেনদেন হয়েছে। ব্যাংকের তুলনায় খুচরা বাজারে বেশি দাম পাওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশীরা হুন্ডির মাধ্যমে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহের বিপর্যয় থামানো যাবে না বলে জানান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আবার ধীরে ধীরে ডলারের বিনিময় হারও বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংকে ডলারের দাম বাড়লে কার্ব মার্কেটেও বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে ডলারের বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে না। বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে হলে প্রভাবশালী হুন্ডি কারবারিদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হলে তবেই হুন্ডির বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

আমদানি দায় মেটানোর পাশাপাশি বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। ডলারের সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ হাজার ১১৫ কোটি বা ২১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সে হিসাবে গত দুই বছরের ব্যবধানে রিজার্ভের পরিমাণ অর্ধেকেরও অনেক নিচে নেমে এসেছে।

দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে। সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ৩৪ কোটি ডলার। যদিও দুই বছর আগে ব্যাংকটির মাধ্যমে মাসে ৬০ কোটি ডলারও রেমিট্যান্স এসেছিল।

জানতে চাইলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা বিশ্বেই এখন হুন্ডির বাজার বেশ শক্তিশালী। এ কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। জাতীয়ভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব ইসলামী ব্যাংকের ওপরও পড়েছে। আমরা রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৭ কোটি বা ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমে ২ হাজার ১৩০ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। গত অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১৬১ কোটি ডলার। গত দুই অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থবিরতা চললেও এ সময় বিদেশগামী অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, শুধু চলতি ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ৬ লাখ ১৭ হাজার ৫৭৬ জন বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গেছেন। ২০২২ সালে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ জন। এর আগে ২০২১ সালেও ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ বাংলাদেশী শ্রমিক অভিবাসী হয়েছেন। সব মিলিয়ে গত আড়াই বছরে বিদেশের শ্রমবাজারে নতুন করে ২৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ জন বাংলাদেশী যুক্ত হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী বিদেশ গেলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।




সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রেমিট্যান্স এলো ৩৭ কোটি ডলার

প্রবাসীদের কাছ থেকে চলতি মাসের প্রথম ৭ দিনে দেশে এসেছে ৩৬ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার। এ হিসাবে প্রতিদিন রেমিট্যান্স এসেছে গড়ে ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার। রোববার (১০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে বিষয়টি জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ৭ দিনে ৩৬ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আর বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৯ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার ডলার ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সদ্যবিদায়ী আগস্ট মাসে প্রবাসীরা দেশে ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় রেমিট্যান্স এসেছে ৭৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এছাড়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। চট্টগ্রামে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৪২ কেটি ৬৯ লাখ ডলার। আর প্রবাসীরা সিলেট বিভাগে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, খুলনা বিভাগে ৬ কোটি ২১ লাখ ডলার, রাজশাহী বিভাগে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলার, বরিশাল বিভাগে ৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলার, ময়মনসিংহ বিভাগে ২ কোটি ৭৭ লাখ ডলার ও রংপুর বিভাগে ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, আগস্ট মাসে দেশে আসা ১৫৯ কোটি ৯৪ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৮ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আর বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ১৩৭ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ডলার ও বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৩ লাখ ১০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।

এদিকে সদ্যবিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১৬১ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স, যা সদ্যবিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৫৭ কোটি ৮৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার কম।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, সদ্যবিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৩৯ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আর বিশেষায়িত ব্যাংকের মাধ্যমে ৫২ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার ৭৬১ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৭ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স


সদ্যবিদায়ী অর্থবছরের জুলাইতে ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার, আগস্টে ২০৩ কোটি ৬৯ লাখ ৩০ হাজার, সেপ্টেম্বরে ১৫৩ কোটি ৯৬ লাখ, অক্টোবরে ১৫২ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার, নভেম্বরে ১৫৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার, ডিসেম্বরে ১৬৯ কোটি ৯৭ লাখ, জানুয়ারিতে ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার, ফেব্রুয়ারিতে ১৫৬ কোটি ৪ লাখ ৮০ হাজার, মার্চে ২০২ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার, এপ্রিলে ১৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার, মে মাসে ১৬৯ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ও জুন মাসে এসেছিল ২১৯ কোটি ৯০ লাখ ১০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।




জুলাই থেকে একক দামে বৈদেশিক মুদ্রা বেচাকেনা

আগামী জুলাই থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা (বিশেষ করে ডলার) একক দাম চালু হতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দাম নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দেবে ডলার।

সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের অফিসে ব্যাংক খাত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড(এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন। এসময় সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।

এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়া কতটুকু প্রয়োজন তা নিয়ে চিন্তা করা উচিত। ৬ ও ৯ শতাংশ হারে যে সুদহার বেধে দেওয়া হয়েছিল তা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। এখন আসছে মুদ্রানীতিতে যদি সুদহারে ক্যাপ তুলে দেওয়া হয় তারপরও তা বাজারভিত্তিক হবে না বলে মনে করে এবিবি। তবে এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, গেল বছরের থেকে এখন স্বস্তিতে ফিরছে দেশের ব্যাংক খাত। ২ কিংবা ১টা ব্যাংক ছাড়া কোন ব্যাংকে ডেফার পেমেন্ট বাকি নেই। তবে ২০১৮ বা ২০১৯ সালের মতো অবস্থায় আসতে এখনও বেশ সময় লাগবে।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি বলেন, ২০২২ সালে বহির্বিশ্বের কারণে দেশে যে অর্থনৈতিক মন্দা, সামষ্টিক অর্থনীতির যে চাপ , রিজার্ভের যে সংকট গেছে তা গেল ৩৫ বছর দেখেনি দেশের ব্যাংক খাত। গেল বছরের জুন-জুলাইয়ে ভয়াবহ মন্দাতে গেছে দেশ। এ বছরেই টাকার মান কমেছে ২৫ শতাংশ যা অকল্পনীয়। ডলার সংকট কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি শুরু করায় মূলত তারল্য সংকট দেখা দেয়।