সিঙ্গাপুর থেকে কেনা হচ্ছে ৫০ হাজার টন গম

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর থেকে ৫০ হাজার টন গম আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

বুধবার (২৫ অক্টোবর) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহবুব খান বিস্তারিত জানান।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্যাকেজ-৩ এর আওতায় ৫০ হাজার টন গম কেনার অনুমোদন পেয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। সিঙ্গাপুরের এম/এস অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে এ গম কেনা হবে। এই লটের গাড়ি কিনতে মোট ব্যয় হবে ১৬৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

এছাড়া আলাদা আরেকটি প্রস্তাবে খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সাইলোর বিএমআরইকরণ কার্যক্রম সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ভিগান ইঞ্জিনিয়ারিং এস.এ বেলজিয়ামের কাছ থেকে ৬৩ কোটি ২১ লাখ টাকায় ক্রয়ের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে ক্রয় কমিটি।




কমানো হলো গম আমদানির সময়সীমা

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য আমদানির সময়সীমা কমানো হচ্ছে। আগে বিদেশ থেকে আমদানি পণ্য ৪২ দিনের মধ্যে সরবরাহ করতে হতো। জরুরি প্রয়োজনে এখন থেকে তা ১৫ দিন করা হয়েছে। এ বিষয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ এর বিধি ৮৩ (১) (ক) প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয়ের লক্ষ্যে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় কমানো হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পাশপাশি আন্তর্জাতিক উৎস থেকে গম সংগ্রহ করে থাকে। চলতি ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন গম সংগ্রহের জন্য বাজেটে অর্থ সংস্থান রেখেছে। দেশের মজুত বৃদ্ধি করে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমদানির ক্ষেত্রে নানা উৎস থেকে দ্রুত খাদ্যশস্য আমদানি করা সহজ হয় এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ মূল্যে খাদ্যশস্য ক্রয় করা সম্ভব হয়। এ কারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবছর জি-টু-জি ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে গম সংগ্রহ করছে।

এ অর্থবছরে ইতিমধ্যে ২টি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে এবং জি-টু-জি ভিত্তিতে গম আমদানির জন্য গত ১৭ আগস্ট তারিখে রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে নেগোশিয়েশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের চেয়ে বেশি মূল্যের প্রস্তাবের কারণে গম ক্রয় করা সম্ভব হয়নি। তবে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ক্রয় প্রক্রিয়া কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় জরুরী প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে জি-টু-জি ভিত্তিতে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন গম আমদানির জন্য পিপিআর,২০০৮ দরপত্র দাখিলের সময়সীমা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে ৪২ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিন নির্ধারণের বিষয়ে গত ১২ জুলাই তারিখে অনুষ্ঠিত ‘অর্র্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির’ অনুমোদন নেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখা, গমের বাজারমূল্য ভোক্তা সাধারণের জন্য সহনীয় ও স্থিতিশীল রাখা এবং সর্বোপরি জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে জরুরিভিত্তিতে বাজেটের নির্দারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ৩ লাখ মেট্রিক টন গম আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে অনুসরণ করে ক্রয় করা প্রয়োজন।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ এর সর্বশেষ সংশোধনী মোতাবেক বিধি ৮৩ (১) (ক) এ বিধান রয়েছে, ‘(ক) দরপত্র দাখিলের সময়সীমা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য সব দরপত্রদাতার কাছে দরপত্র দাখিলের আহ্বান পৌঁছায় এবং তারা দরপত্র প্রস্তুতি ও দাখিলের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায় এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার ক্ষেত্রে তফসিল-২ এ বর্ণিত ন্যূনতম সময় দিতে হবে; তবে শর্ত থাকে যে, সরকার, আইন এর ধারা ৬৮ এ বর্ণিত রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বা বিপর্যয়কর কোনো ঘটনা মোকাবিলার জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশক্রমে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময়সীমা হ্রাস করতে পারবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের আওতায় ৩ লাখ মেট্রিক টন গম ক্রয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ এর বিধি ৮৩ (১) (ক) অনুসরণ করা হবে। সে অনুযায়ী দরপত্র দাখিলের সময়সীমা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ থেকে ৪২ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিন করার একটি প্রস্তাব সম্প্রতি অনুমোন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হওয়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হবে। বৃহত্তর জনস্বার্থেই কমিটি প্রস্তবাটিতে অনুমোদন দিয়েছে।




৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির উদ্যোগ

দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম ৩০৪.৮৩ ডলার হিসেবে এতে মোট ব্যয় হবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬৬ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ২৫০ টাকা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক মেসার্স অ্যাগ্রোকরপ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড এসব গম সরবরাহ করবে।

সূত্র জানায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। সে অনুযায়ী গত ৯ আগস্ট সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাজেটে গম আমদানির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খাদ্য অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে। নির্ধারিত সময়ে ১০টি সিডিউল বিক্রি হয়। এর মধ্যে চারটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। মূল্যায়ন কমিটি চারটি দরপত্রকেই রেসপন্সিভ ঘোষণা করে।

দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সিঙ্গাপুরভিত্তিক মেসার্স অ্যাগ্রোকরপ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম ৩০৪.৮৩ মার্কিন ডলার উল্লেখ করে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়। অন্য তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মেসার্স সিরিঅ্যাল করপস ট্রেডিং এলএলসি প্রতি মেট্রিক টনের দাম ৩০৯.০০ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মেসার্স গ্রেইন ফ্লাওয়ার ডিএমসিসি ৩১৩ মার্কিন ডলার এবং সুইজারল্যান্ডের মেসার্স অ্যাসটন অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসএ প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম ৩২২.২২ মার্কিন ডলার উল্লেখ করে।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিদ্যমান বাজারমূল্যেও গ্রহণযোগ্য মাত্রার সঙ্গে প্রাপ্ত সর্বনিম্ন দরের সামঞ্জস্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে গত ৫ আগস্ট, ২০২৩ পর্যন্ত অ্যাগ্রিমার্কেট উইকলি ইনডেক্স ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ এফওবি দরের সঙ্গে জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য সম্ভাব্য আনুসঙ্গিক খরচ বিবেচনা করে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া দরের সঙ্গে প্রাক্কলিত বাজারমূল্যের তালিকা করে। এতে গামের দাম রাশিয়া থেকে প্রতি মেট্রিক টন ৩০৫.০৮ মার্কিন ডলার, ইউক্রেন থেকে ২৬৬.৬৬ মার্কিন ডলার, ফ্রান্স থেকে ৩১৩.৯৯ মার্কিন ডলার, আর্জেন্টিনা থেকে ৩৯৭.২৫ মার্কিন ডলার, অস্ট্রেলিয়া থেকে ৩৩৩.৮৭ মার্কিন ডলার, কানাডা থেকে ৪০৪.৪০ মার্কিন ডলার এবং আমেরিকা থেকে ৪০৭.৪৫ মার্কিন ডলার পাওয়া যায়।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে কোটেশনে অংশগ্রহণকারী চারটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রহণযোগ্য দরদাতা ঘোষণা করে। গ্রহণযোগ্য দরদাতাদের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স অ্যাগ্রোকরপ ইন্টারন্যাশনালের দাখিল করা দরপত্রে উদ্ধৃত দর প্রতি মেট্রিক টন ৩০৪.৮৩ মার্কিন ডলার। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সঙ্কট এবং খাদ্যশস্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় মেসার্স অ্যাগ্রোকরপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের দর বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত প্রতি মেট্রিক টন ৩০৪.৮৩ মার্কিন ডলার (প্রতি কেজি ৩৩.৩৭৮৮ টাকা) গ্রহণের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সুপারিশ করেছে। সেই হিসেবে ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি করতে সরকারের ব্যয় হবে ১৬৬ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ২৫০ টাকা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি অনুয়ায়ী গমের বর্তমান মজুত ২ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে সরকারি বিতরণ খাতে ৬ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন এবং নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনসহ মোট ৯ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন গম প্রয়োজন হবে। খাদ্য বিভাগের ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আমদানির জন্য নির্ধারিত পরিমাণ ৬ লাখ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে প্যাকেজ-২ এর আওতায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্যাকেজে প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম পড়বে ৩০৪.৮৩ ডলার। এর আগের প্যাকেজ-১ এর আওতায় আমদানি করা প্রতি মেট্রিক টন গমের দাম পড়েছে ২৯৭.৪৭ ডলার। অর্থাৎ প্যাকেজ-১ এর চেয়ে প্যাকেজ-২ এ প্রতি মেট্রিক টন গম আমদানি করতে ৭.৩৬ ডলার বেশি ব্যয় করতে হবে।

এ সংক্রান্ত একটি ক্রয় প্রস্তাবে অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।