নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনুসরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার স্বাক্ষরিত পৃথক দুই প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ১৩ আগস্ট, ২০২৪ তারিখের ৫৩.০০.০০০০.৩১১.১১.০১৬.১৭-৬০ সংখ্যক প্রজ্ঞাপনমূলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগকৃত ড. আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ এতদ্বারা বাতিল করা হলো।’

পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে, মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তার যোগদানের তারিখ থেকে ৪ (চার) বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হলো।

এতে আরও বলা হয়, গভর্নর পদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করবেন। নিয়োগের অন্যান্য বিষয়াদি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য ও হিরা সোয়েটারের মালিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

এর আগে বুধবার দুপুরে, ‘সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে’—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ত্যাগ করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

চলে যাওয়ার সময় নতুন গভর্নর নিয়োগ ও তার পদত্যাগের বিষযয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা পোস্টকে গভর্নর বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি, তবে খবরে শুনেছি।’ এর বাইরে আর কিছু বলেননি তিনি।

সূত্র জানায়, সকালে নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে কার্যালয়ে আসেন আহসান এইচ মনসুর। এর মধ্যেই তার অপসারণের খবর বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

এ খবর শোনার পর তিনি সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা না বলে তাৎক্ষণিক অফিস ত্যাগ করেন। তার এই আকস্মিক প্রস্থান ঘিরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যালয়ে কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার (৯ আগস্ট বিকেলে) পদত্যাগ করেন। এরপর ওই বছরের ১৩ আগস্ট আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়।




জুনে রিজার্ভ দাঁড়াবে ৩০ বিলিয়ন ডলার: গভর্নর

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগামী মাসে অর্থাৎ, জুনে এ রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, আগামী মাসে রিজার্ভ ২৭ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার হবে। রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার জন্য সময় প্রয়োজন। এখন সবাইকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে।

বুধবার (২১ মে) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) আয়োজনে রাজধানীর গুলশানে হোটেল আমারিতে ‘বাংলাদেশে আর্থিক উন্নয়নের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আইজিসি) সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, এ গবেষণা সেসব অঞ্চল চিহ্নিত করেছে, যেখানে আর্থিক সেবা এখনো অসম। আমাদের এখন নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো জেলা বা সম্প্রদায় পিছিয়ে না থাকে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, এ গবেষণা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নের একটি স্থানিক ও কালানুক্রমিক চিত্র উপস্থাপন করেছে, যা জাতীয় গড়ের আড়ালে থাকা গভীর আর্থিক বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক উন্নয়নের জন্য প্রথমেই চিহ্নিত করতে হবে যে, দেশের কোন কোন অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী মূলধারার ব্যাংকিং সেবা থেকে বাদ পড়ে আছে।

পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান মূল তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, আমাদের বিশ্লেষণে আর্থিক প্রবেশগম্যতার চরম বৈষম্য ফুটে উঠেছে। জাতীয়ভাবে মাত্র এক শতাংশ ঋণ হিসাবধারী সব ঋণের ৭৫ শতাংশ পাচ্ছে। ৭৮ শতাংশ ঋণ ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত।

ড. আশিকুর রহমান বলেন, দশকব্যাপী ব্যাংক সম্প্রসারণ সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো ধনী পূর্বাঞ্চলে ঘনীভূত রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা দেশের দরিদ্র অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে না বা সেবা দিচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতিগত প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো গরিবদের জন্য ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে না।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকদের মধ্যে ছিলেন আইজিসির বাংলাদেশের সিনিয়র উপদেষ্টা ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (পরিসংখ্যান) মো. আনিস উর রহমান। তারা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো পরিমার্জন এবং তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি উন্নত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।




আইএমএফের ঋণ বাংলাদেশের জন্য জরুরি নয় : গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর সঙ্গে চলমান আলোচনা থাকলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাদের ঋণ গ্রহণ খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

শুক্রবার ওয়াশিংটনে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা এখনো আইএমএফের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাইনি, তবে আমাদের অবস্থান একেবারে দূরত্বেও নেই। যদি সমঝোতা না-ও হয়, তবুও বাংলাদেশে কোনো বড় সমস্যা হবে না, আমাদের অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই চলবে।

গভর্নর মনসুর বাংলাদেশের মিশনের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন, যা তিনি শনিবার (২৬ এপ্রিল) সকালে তার ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করেন।

গভর্নর মনসুর বলেন, আমাদের নিজেদের ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সংস্কার করতে হবে, এবং আইএমএফ শুধু সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। যদি মনে করি ঋণ আমাদের সহায়ক নয়, তবে আমরা নেব না।

মনসুর বলেন, আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্ট সহায়তা না পেলেও আমাদের কোনো সমস্যা হবে না। এটা শুধুমাত্র একটি অতিরিক্ত সুবিধা, যদি না পাই, তাও সমস্যা হবে না। আমাদের রিজার্ভ এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে মন্সুর বলেন, আলোচনার মূল বিষয় হলো সংস্কার — আর্থিক খাতের সংস্কার, কর ব্যবস্থার সংস্কার। অর্থ (ঋণ) মূল উদ্দেশ্য নয়।

তিনি আরও জানান, প্রধানত মুদ্রার বিনিময় হার এবং রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। রাজস্বের বিষয়ে মোটামুটি সমঝোতা হয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো — বাজার এখন স্থিতিশীল, ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না।

গভর্নর মনসুর বলেন, আমরা শ্রীলঙ্কা হইনি, পাকিস্তানও হইনি। আমাদের এখন কোনো চাপে পড়ে ঋণ নিতে হচ্ছে না। ছয় মাস আগে হয়তো এমন অবস্থা ছিল, কিন্তু এখন নয়।

এসময় আর্থিকখাতে সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকৃত লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক খাতকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ২৪-২৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। যদি কিছু (আইএমএফের ঋণ) সহায়তা পাইও, কয়েক বিলিয়নের বেশি পাব না। তাই সংস্কারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যান্য দাতা সংস্থার প্রসঙ্গে মনসুর বলেন, প্রকল্প ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো অতিরিক্ত শর্ত থাকে না, তবে বাজেট সহায়তা ঋণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্ত থাকে।

আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অধীনে ২৩১ কোটি ডলার ইতিমধ্যে ছাড় হয়েছে। আরও ২৩৯ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে।

 




১৭ ব্যাংকের সঙ্গে গভর্নরের বৈঠক

আর্থিক অনিয়মে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আরো বেশি অর্থ সহায়তা দিতে সবল ব্যাংকগুলোকে আহ্বান জা‌নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। একইসঙ্গে যেসব ব্যাংক ঋণপত্র বা এলসি দায় পরিশোধে বিলম্ব করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সোমবার (১১ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর। সেখানে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বৈঠকে ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের এমডি এবং বেসরকা‌রি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন, সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্‌–বাংলা, পূবালী, প্রাইম ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, যমুনা, সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীরা।

বৈঠকে ডলার মার্কেট, দুর্বল ব্যাংকের পরিস্থিতি, ক্রেডিট কার্ড রেট, রাইট-অফ পলিসি, ব্যাংকারদের ব্যধাতামূলক ডিপ্লোমা পরীক্ষা এবং সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়।

হুসনে আরা শিখা বলেন, ‘যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো রয়েছে, তারা যেন সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি তারল্য সহায়তা করে সেই আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর।’

তিনি বলেন, ‘ডলার মার্কেট নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি না তা গভর্নর জানতে চান। ব্যাংকগুলো জানায়, ডলার মার্কেটে আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত আরো উন্নতি হবে। বর্তমানে ডলার মার্কেটে চ্যালেঞ্জ না থাকলেও ওভারডিউ বা মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির দায় পরিশোধে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিছু ব্যাংক এলসির দায় যথাযথ সময় পরিশোধ করছে না। এতে করে অন্য ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়‌ছে।’

এ বিষয়ে গভর্নরের বক্তব্য উদ্বৃত করে তিনি বলেন, ‘ডলার মার্কেটে কেউ যাতে কারসা‌জি না করে। কোনো ব্যাংক যাতে বেশি দরে বিক্রির জন্য ডলার ধরে না রাখে। আবার ক্রস কারেন্সিতে ট্রান্সফার করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা না করে। ভবিষ্যতে যেসব ব্যাংক এলসির দায় পরিশোধে বিলম্ব করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রসাশনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের এলসি খুলতে দেওয়া হবে না।’

মুখপাত্র বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ডের পেছনে ব্যাংকগুলোর অনেক খরচ। সেই অনুযায়ী সুদহার অনেক কম। তাই ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়ানোর জন্য গভর্নরকে অনুরোধ করেছেন। এছাড়া রাইট-অফ পলিসি পরির্বতনের করতে বলা হয়। রাইট-অফ করার দুই বছর পর যে মামলা করা যায়, তা যেনো সঙ্গে সঙ্গে করতে পারে। তবে এই বিষয়ে গভর্নর কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি ব্যাংকের একজন এমডি বলেন, ‘বেশকিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ডলার মার্কেট উন্নতি হয়েছে, তা জানানো হয়েছে। আবার যেসব দুর্বল ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে, তাদের মধ্যে কিছু ব্যাংকের উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও অনেক ব্যাংকের সংকট রয়েছে। যেসব ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে ভুগছে, তাদের তারল্য সহায়তা করার জন্য যাদের তারল্য রয়েছে তাদের এগিয়ে আসতে বলেছেন গভর্নর।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে কিছু ব্যাংকের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গ্রাহকদেরও আস্থা ফিরেছে। যারা এখনও সংকটে রয়েছে, তারা সহায়তা পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জর্জরিত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২০ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ১১টি ব্যাংকের পর্ষদে পরিবর্তন আনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। যার ম‌ধ্যে আটটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিল এস আলম গ্রুপ। এগুলো হলো- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়া, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল তারা। এ ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। তবে এর ম‌ধ্যে ৬টি ব্যাংকের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের অনেক শাখায় লেনদেন করার মতো নগদ টাকা নেই, লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমানতকারীদের চাপে শাখা ব্যবস্থাপকসহ ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা প্রতিদিনই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তঃব্যাংক মার্কেট থেকে ভালো ব্যাংকগুলো থেকে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পক্ষে গ্যারান্টি দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে গত দেড় মাসে ৫ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি হলো, কোনো কারণে কোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই টাকা দেবে। আপাতত কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি টাকা না দিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে ধারের ব্যবস্থা করছে। অর্থাৎ বাজারের টাকা এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি প্রভাব পড়বে না।

এদি‌কে সংকটে পড়া সাত ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার তারল্য-সহায়তা চায়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ৫ হাজার কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৭ হাজার ৯০০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ২ হাজার কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংক ১ হাজার ৫০০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক সাড়ে ৩ হাজার কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ৫ হাজার কোটি ও এক্সিম ব্যাংক ৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েছে।

এস আল‌মের ৮‌টি ছাড়া পর্ষদ পুনর্গঠন করা অন্য তিন ব্যাংক হ‌চ্ছে- আইএফআইসি, ইউসিবি ও এক্সিম ব্যাংক।

এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দখলে ছিল আইএফআইসি ব্যাংক, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংকের দখলে ছিলেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।




একীভূত হতে পারে সংকটে থাকা ছোট ব্যাংকগুলো : গভর্নর

দেশের বেসরকারি খাতের নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের চলতি হিসাবের ঘাটতি ১৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ছোট ব্যাংক আছে; যেগুলো বেশ তারল্য সংকটে পড়েছে। এদের বেশিরভাগই শরীয়াহ ধারায় পরিচালিত। এসব ছোট ছোট ব্যাংক একীভূত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ ইঙ্গিত দেন তিনি।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, তারল্য সংকটে থাকা কিছু ছোট ব্যাংককে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ মালিকানা এখন সরকারের অধীনে। তাই সরকারের ক্ষেত্রে একীভূত করা সহজ হবে। তবে, বাস্তবতা বুঝে আমরা কাজ করব। ব্যাংক একীভূত হলেও আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা নয়টি ব্যাংকের অডিট করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছি। আমরা তিনটি করে ব্যাংকের অডিট করব। এ প্রক্রিয়ার শুরুতেই ইসলামী ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত থাকবে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের প্রতিটি ঋণ অডিট করা হবে এবং সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা হবে।

এছাড়া, বর্তমানে তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর নিট ডিপোজিট ইতিবাচক রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সমস্যায় থাকা ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহক টাকা তুলে অন্য ব্যাংকের রাখছে জানিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, যেসব ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হচ্ছে, তারা তারল্য সংকটে পড়ছে। আবার যাদের কাছে রাখা হচ্ছে তাদের তারল্য বেড়ে যাচ্ছে। এ জন্য আমরা গ্যারান্টার হয়ে তারল্য বেশি থাকা ব্যাংকগুলো থেকে কম থাকা ব্যাংকগুলোকে টাকা দেব। এক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংক টাকা না দিতে পারলে ওই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক পরিশোধ করবে। এখন পর্যন্ত এই স্কিম থেকে কাউকেই টাকা দেওয়া হয়নি। যদি এদের অবস্থা ভালো হয়ে যায়, তাহলে কাউকে দিতেও হবে না। প্রয়োজন বোধে দেব। যার যত টাকা দরকার সেই অনুযায়ী টাকা দেওয়া হবে। তবে, এসব ব্যাংকে এখন ক্যাশ-ফ্লো ভালো রয়েছে। গত কয়েকদিনে ব্যাংকগুলোর তারল্য উদ্বৃত্ত আছে ৮১০ কোটি টাকা। আশা করি সমস্যা সমাধান হবে।

বাড়ানো হবে নীতি সুদহার

বাড়তে থাকা খাদ্যপণ্যের তথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফের পলিসি রেট বা নীতি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি সপ্তাহে এ সুদহার বাড়ানো হবে। পর্যায়ক্রমে তা আগামী মাসেও বাড়বে বলে জানান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৯.৭৩ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া. গত জুলাইয়ে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১.৬৬ শতাংশ হয়, যা ২০১০-১১ অর্থবছরের পর সর্বোচ্চ। গেল অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি ছিল।

পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০২২ সালের মে মাস থেকে বেশ কয়েকবার সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পলিসি রেট বাড়াচ্ছে। নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়েছে এবং ঋণ নেওয়া আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

প্রভাবশালীদের দখল মুক্ত ১১ ব্যাংক

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় আটটি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। এগুলো হলো, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়া, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল তারা।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়। এর মধ্যে এস আল‌মের নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটিসহ মোট ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠন করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্ষদ পুনর্গঠন করা অন্য তিন ব্যাংক হলো, আইএফআইসি, ইউসিবি ও এক্সিম ব্যাংক।

এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দখলে ছিল আইএফআইসি ব্যাংক, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক।

এছাড়া, এক্সিম ব্যাংকের দখলে ছিলেন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও প‌রিচালক‌দের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।

 




বাজারে আসছে গভর্নরের সই করা ১০০ ও ২০০ টাকার নোট

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সই করা ১০০ ও ২০০ টাকা মূল্যমানের ব্যাংক নোট বাজারে আসছে। মঙ্গলবার (২০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস থেকে এ নোট ইস্যু করা হবে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য অফিসেও পাওয়া যাবে।

সোমবার (১৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নতুন মুদ্রিত ১০০ ও ২০০ টাকা মূল্যমান নোটের রং, আকৃতি, ডিজাইন ও সব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য আগের মতো অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন মুদ্রিত বর্ণিত নোট দুটির পাশাপাশি বর্তমানে প্রচলনে থাকা ১০০ ও ২০০ টাকা মূল্যমানের অন্যান্য নোটও চালু থাকবে।