গণমাধ্যমকে অন্ধকার গলি থেকে মুক্ত আকাশে বের করেছেন শহীদ জিয়া: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এবং ১৬ জুনের সংবাদপত্র বাতিলের কালো আইনের মধ্য দিয়ে দেশের গণমাধ্যম যে অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়েছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম না হলে সেখান থেকে গণমাধ্যমকে আবার মুক্ত আকাশে বের করা সম্ভব হতো কিনা-ইতিহাসে সেই প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যুগ যুগ ধরে শহীদ জিয়াউর রহমানকে সসম্মানে স্মরণ করতে হবে, কারণ তিনি স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করেছেন।’

আজ রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে তিনি এ কথা বলেন।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে এবং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ূব ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

শহীদ জিয়ার ঐতিহাসিক নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত দুইটার সময় কারো নির্দেশ বা প্ররোচনা ছাড়াই ৩৬ বছর বয়সের একজন বাঙালি মেজর একটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক শক্তি সম্পন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেবল নিজের সততা, মূল্যবোধ, চেতনা ও দেশপ্রেমের ওপর ভর করে তিনি ক্যান্টনমেন্ট ও দেশবাসীর সামনে সংকটকালীন সময়ের সমাধানের পুরুষ হিসেবে হাজির হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, যারা ইতিহাস সম্পর্কে অবগত তারা জানেন, ২৫ মার্চের সেই রাতে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা না করলে জাতি দিকনির্দেশনাহীন থাকতো। একইভাবে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা যদি তাঁকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে না আসতো, তবে দেশে শান্তির ছায়া নেমে আসতো না।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জিয়াউর রহমান একজন সামরিক কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মনোজগৎ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করেছে তিনি একজন মহান রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ওপর হওয়া অসম্মানজনক আচরণকে তিনি যেভাবে রাষ্ট্রনায়কের মতো হজম করেছেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভর করে দেশের সকল ভিন্ন মতের জন্য সমালোচনা করার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন, তা নজিরবিহীন।’

মন্ত্রী আরও বলেন, শহীদ জিয়া বঞ্চিত রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতির মাঠে এনে গঠনমূলক তর্ক-বিতর্কের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি চতুর্থ সংশোধনীর সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে দিয়ে কবর দেওয়া পার্লামেন্টকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। ভিন্ন মতকে সম্মান করা এবং বহুমাত্রিক চিন্তার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের গতি নির্ধারণ করাই ছিল তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত বৈশিষ্ট্য।

গণমাধ্যম সম্পর্কে শহীদ জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর কোনো নেতাই জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন না, যদি না তিনি গণমাধ্যমের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি চর্চা করেন। শহীদ জিয়া শুধু গণমাধ্যমকে অবকাঠামোগত বা আর্থিক সুবিধাই দেননি, বরং গণমাধ্যম যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের পরিচ্ছন্ন আয়না হিসেবে কাজ করতে পারে-সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁর সেই অবদানের কারণেই আজ সমাজ ও রাষ্ট্র জনগণের কাছে সার্বক্ষণিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহীদুল ইসলাম এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।




গণমাধ্যমের বড় অংশ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে : মির্জা ফখরুল

দেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এখন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (১৪ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় মির্জা ফখরুল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন, রাষ্ট্রদর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এর আগে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গতকাল রাতে আমার জ্বর হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবুও আপনাদের দেখতে ভালো লাগে। বয়সের কারণে নয়, মনের টান থেকেই এখানে এসেছি।

গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মিডিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মিডিয়া এখন আর শুধু মিডিয়া নেই। অনেক ক্ষেত্রেই তা বিজনেস হাউজের প্রতিনিধি হয়ে গেছে। চাটুকারিতা কাকে বলে, তা সাম্প্রতিক সময়ের কিছু গণমাধ্যমের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। আমরা আশা করি, সাংবাদিক সমাজ স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।

জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গবেষণার ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জিয়াউর রহমান সম্পর্কে যতটা গবেষণা হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি। এটি ইতিহাসের প্রতিই এক ধরনের অবিচার। তরুণ গবেষকদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা। আমি একজন বাংলাদেশি—এই পরিচয়কে তিনি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আমি মনে করি, এটি তার অন্যতম বড় অবদান।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রই সবচেয়ে উত্তম শাসনব্যবস্থা। ১৯৭৫-পরবর্তী অস্থির সময়ে তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন।

বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রেজিমেন্টের দল নয়। এটি একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে।

অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স অর্থনীতি, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি গবেষণা ও উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার দূরদর্শী উদ্যোগ দেশের উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে।

কুষ্টিয়ার একটি সফরের স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। তিনি একটি গ্রামের বৃদ্ধার কাছ থেকে পানি ও পেয়ারা চাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, এই ছোট্ট ঘটনাই প্রমাণ করে, তিনি মানুষের কতটা কাছের ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর তার জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, লাখো মানুষের নীরব অশ্রু ও উপস্থিতি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান কত গভীর ছিল।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধিতেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার দূরদর্শিতা আজও স্মরণীয়।

সমালোচনার জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে, কিন্তু ইতিহাস এরই মধ্যে তাকে সম্মানিত করেছে। ইতিহাসে তার অবস্থান অমলিন।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরও বলেন, একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বিএনপি ধারণ করে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ডিইউজের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ।