তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা : বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের ব্যাংক খাতে গত তিন মাসে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আর মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এছাড়া দেশে চলতি মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। নীতি সহায়তা ও নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা ঋণ পুনঃতপশিল করে নেওয়ার পরেও খেলাপি ঋণ বাড়ার ঘটনা ঘটল।

মার্চ শেষে দেশে মোট খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

তিন মাসে খেলাপির হার বেড়েছে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপির হার ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।

 




অর্থঋণ মামলার তথ্য বছরে দুইবার জমা দেওয়ার নির্দেশ

খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে করা মামলার তথ্য প্রতিবছর দুইবার বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সোমবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, অর্থঋণ ও অন্যান্য আদালতে ব্যাংকগুলোর দায়ের করা ও নিষ্পত্তি করা মামলার বিস্তারিত তথ্য প্রতিবছর ৩০ জুন ও ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক দুই দফায় জমা দিতে হবে। মামলার আগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে আদায় হওয়া ঋণের তথ্যও একইসঙ্গে জমা দিতে হবে। এই তথ্য ব্যাংকগুলোকে হার্ডকপি ও সফটকপি—দু’ভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিভিন্ন সময় ব্যাংকগুলো থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের তথ্য একাধিকবার দিতে হয়। এতে সময় ও শ্রমের অপচয় হয়। এসব সমস্যা এড়াতেই তথ্য জমাদানে নতুন করে নিয়ম-কানুন ঠিক করা হয়েছে।

এছাড়া ঋণ বা বিনিয়োগ অবলোপনের তথ্য আগে হার্ডকপিতে জমা দিতে হতো, এখন তা আর লাগবে না। শুধুমাত্র ইডিডব্লিউ পোর্টালে জমা দিলেই চলবে। একইভাবে আমদানি-পরবর্তী অর্থায়নের তথ্য আগে একাধিক বিভাগে জমা দিতে হতো, এখন তা কেবল ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশনে দিলেই যথেষ্ট হবে।




চট্টগ্রামে এস আলমের বাসার সামনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবস্থান

খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে যাওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ওরফে মাসুদের চট্টগ্রামের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।

মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ওই বাসভবনের সামনে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ব্যাংকটির চট্টগ্রাম অঞ্চল ও নগরের ১১টি শাখার শতাধিক কর্মকর্তা।

অবস্থান কর্মসূচিতে নিজেদের মুখ ঢাকতে মুখে মাস্ক পরেন এস আলমের নিয়োগ দেওয়া অনেক কর্মকর্তা। কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের বকেয়া বিনিয়োগ আদায়ে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে তারা সাবেক চেয়ারম্যানের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ব্যাংকের কাজ হলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিপোজিট নিয়ে অন্যত্র বিনিয়োগ করা। বিনিয়োগের টাকা সময়মতো আদায় করা না গেলে যারা ডিপোজিট রেখেছেন তাদের টাকাও চাহিদা মতো ফেরত দেওয়া কঠিন। ব্যাংক চেয়ারম্যানের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় এখন ব্যাংকে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

‘এই সংকট সমাধানে আমাদের সবচেয়ে বড় গ্রাহক এস আলম গ্রুপ এবং এই গ্রাহক সংশ্লিষ্ট যে বিনিয়োগগুলো আছে তা আদায়ের জন্য প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে আজ আমরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি’- বলেন তিনি।

ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক মোশাররফ হোসেইন চৌধুরী বলেন, ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের কাছে আমাদের ব্যাংকের বড় অংশের বিনিয়োগ রয়েছে। সেটি আদায়ে আমাদের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এখানে অবস্থান নিয়েছি।

জানা গেছে, বাংলাদেশে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে এস আলম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিনিয়োগ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। যেখানে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই বিনিয়োগ ৩৫ হাজার কোটি টাকা।




খেলাপি আদায়ে অর্থঋণ আদালতকে আরো সক্রিয় করা হবে

খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতকে আরো সক্রিয় করা হবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। একইসঙ্গে হাইকোর্টে হওয়া রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হবে না।

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন তিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন উপদেষ্টা।

খেলাপি ঋণ আদায়ে গভর্নরকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হবে কিনা? সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতকে আরো সক্রিয় করা হবে। তবে গভর্নরকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের রিট মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য দুটি বেঞ্চ রয়েছে। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ও গভর্নরের সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে, যাতে এই বেঞ্চগুলো আগামী তিন মাস শুধু রিট মামলাগুলো পরিচালনা করে।

কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না উল্লেখ করে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, কিছু ব্যাংক হয়ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে, ব্যাংক খাতের যেসব খারাপ সিনড্রোম ছিল সেগুলো কারেকশন হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে। কোনো ব্যাংক বন্ধ করার ইচ্ছা সরকারের নেই। এটা আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করছি। আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে ব্যাংক খাতে হারানো আস্থা ফিরে আনায় আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ভালো ব্যবসায়ীদের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা ঋণ নিয়ে ঠিকমতো ফেরত দেন এবং ঠিকমতো কর দেন, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তারাই ভীতু হয়ে আছে যারা বিগত সরকারের সময়ে নানাভাবে অনেক কিছু করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক এ প্রসঙ্গে বলেন, যেসব দুর্বল ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, তারা যাতে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারে সেজন্য খুব দ্রুত উদ্যোগ দেখা যাবে।




ঋণ কেলেঙ্কারি ঠেকাতে ব্যাংক পরিদর্শন বাড়ানোর তাগিদ আইএমএফের

ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ। আর্থিক খাতের এ বিষফোঁড়ার জ্বালা কমাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। কিন্তু সুফল পাচ্ছে না। তাই ঋণ পুনঃতফসিল ও অবলোপনের সুযোগ দিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের মন্দ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

রোববার (২৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সফররত আইএমএফের প্রতিনিধিদল এ পরামর্শ দিয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও এর উপর করা পরিদর্শনের প্রতিবেদন গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত করতে বলা হয়। একই সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারি ঠেকাতে পরিদর্শনের সংখ্যা বাড়ানো তাগিদ দেওয়া হয়।

বৈঠকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকে মন্দ ঋণ বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়েই চলছে। বেশ কিছু ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে; গভর্নর নিজেও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাই যেসব ব্যাংক সমস্যায় আছে ওইসব ব্যাংকের আমানতও ঝুঁকির মধ্যে আছে বলে মনে করছে আইএমএফ। এমন অবস্থায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন গ্রাহকদের জন্য প্রকাশ করতে পরামর্শ দিয়েছে ঋণ দাতা সংস্থাটি। তাদের মতে, এসব প্রতিবেদন প্রকাশ হলে গ্রাহকরা দেখে বুঝে-শুনে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে আমানত রাখার বিষয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

বৈঠকে আইএমএফ ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন অব্যাহত আছে কি না তা জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি পরিদর্শন প্রতিবেদনগুলো গ্রাহকদের জন্য প্রকাশ করা হয় কি না সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারি ঠেকাতে পরিদর্শনের মান ও সংখ্যা বাড়াতে পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফের প্রতিনিধি দল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, আইএমএফ সঙ্গে বৈঠক চলমান আছে। আগামী ৮ তারিখ পর্যন্ত ধাপে ধাপে এই বৈঠক হবে। ওইসময় বিস্তারিত জানানো হবে এর বাইরে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

২০২৬ সালের জুনের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার শর্ত রয়েছে। সে শর্ত অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে ঋণ দাতা সংস্থাটি।

২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে। এ সময় অন্য অনেক শর্তের মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ পাঁচটি আইন প্রণয়নের শর্ত দেওয়া হয়। এসব আইন প্রণয়নের দায়িত্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। অন্য শর্তের মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে এবং বেসরকারি ব্যাংকে তা ৫ শতাংশের কম রাখা।

ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর দুই কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ। তৃতীয় কিস্তিতে ৭০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা আগামী মাসে। তার আগে পর্যালোচনা বৈঠক করতে ঢাকায় আসা আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ বিভাগ এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করছে।




অর্থঋণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপের নির্দেশ

খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে দায়ের করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার ধার্য তারিখে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মামলা পরিচালনার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ নির্দেশনা দিয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়, অর্থঋণ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত গঠন করা হয়েছে। সময়াবদ্ধ কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তির আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন অর্থঋণ মামলার রায় ও আদেশ পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেছে মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। ফলে আমানতকারী ও ব্যাংক উভয়ের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে মামলায় সব পক্ষ বিশেষ করে বাদী ব্যাংকের সুদক্ষভাবে মামলা পরিচালনায় অনেক অবহেলা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা অনাকাক্ষিত। এমন অবস্থায় অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলা যথাসময়ে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সহকারে মামলা পরিচালনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।




সূচকের উন্নয়নে পরিকল্পনা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকবহির্ভূত অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এতে এ খাতের খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি কমানোসহ সার্বিক সূচকের উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল রোববার প্রাথমিকভাবে সাতটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমডি ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক হবে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পরিকল্পনা দিতে বলা হয়েছে, যাতে আগামী ডিসেম্বরের প্রতিবেদন থেকে পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিফলন থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তিন মাস আগে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ছিল ১৭ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ২৫ শতাংশ। বর্তমানে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টির খেলাপি ঋণ রয়েছে ৮০ শতাংশের ওপরে। ১৫টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশের বেশি। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। নানা ছাড়ের পরও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে গত জুন শেষে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট বিতরণ করা ঋণের যা ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।




খেলাপি ঋণ আদায় নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ

খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকায় সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর প্রতিনিধিদল। তারা খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে সরকার গৃহীত পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে।

বাংলাদেশে সফররত আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলটি গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সভায় এসব বিষয়গুলো তুলে ধরে বলে জানা গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষে সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ এবং আইএমএফের পক্ষে ছিলেন সংস্থাটি এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ।

সভা সূত্রে জানা গেছে,সংস্থাটি দেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে উল্লেখ করেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এখনো ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের হাতে থাকা ব্যাংকগুলোর অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ২০ শতাংশে ওপরে চলে গেছে। প্রতিনিয়ত এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেড়েই চলেছে। খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দৃশত কোনো উদ্যোগই কাজে লাগছে না। এ পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক মাসে খেলাপি ঋণের মাত্রা কিভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, আলোচনার শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের সার্বিক বিষয়ে একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে দেখানো হয়, বিগত দিনে ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বলা হয়, বেশ কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ‘বার্ষিক কর্মসম্প্রদান চুক্তি’ (এপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করা হয়। এর আওতায় বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয় ব্যাংকগুলোকে। এ পর্যায়ে আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, এরপরও এসব ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হচ্ছে কেন, খেলাপি ঋণই বা বাড়ছে কেন। এর জবাবে বলা হয়, চেষ্টা করা হচ্ছে, খেলাপি ঋণ কমানোর। আগামী বছরের মাঝামাঝি এর দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়।

এ বিষয়ে আইএমএফ পক্ষ থেকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলা হয়, ঋণের চুক্তি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে।

জানা গেছে, আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সভার অবস্থা জানতে গতকাল দুপুরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে সচিবালয়ে তার কক্ষে ডেকে নেন অর্থমন্ত্রী আ হ মুস্তফা কামাল। এ সময়ে সচিব সভার ফলাফল সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে এ সরকারি ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৬৪ শতাংশই এখন খেলাপি। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণও ১৬ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। সরকারি খাতের সর্ববৃহৎ এ ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ১৯ শতাংশের বেশি। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এ ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশই খেলাপি। বিডিবিএলের খেলাপি ঋণের হারও ৪৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যার পরিমাণ ৯৭১ কোটি টাকা।

গত এপ্রিল-জুন সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। ফলে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকায়। এই খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন দেশে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এখন তা দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ ১৪ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাতগুণ।




অর্থ ঋণ আদালতে সোয়া ২ লাখ মামলা, নিষ্পত্তির দাবি সংশ্লিষ্টদের

 

ব্যাংক খাতে ভয়ানক থাবা খেলাপি ঋণ। বড় অংকের খেলাপির অর্থ ঝুলে আছে ঋণ আদালতে। এ আদালতে খেলাপি ঋণের মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সোয়া দুই লাখ। তাতে আটকে আছে দুই লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘসময় আটকা রয়েছে এসব অর্থ। আটকে থাকা বড় অংকের অর্থ উদ্ধারে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি সংশ্লিষ্টদের।

রোববার (২ এপ্রিল) সকালে ব্যাংক নির্বাহীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে ব্যাংকার্স সভা। বাংলাদেশে ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ সভার আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভায় তফসিলভুক্ত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলা নিষ্পত্তি বিষয়ে মতামত দেবেন বলে জানা গেছে। সভার আলোচ্যসূচিতে রয়েছে সব ব্যাংকের বাংলা কিউআর কোড চালু, নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতিসহ বিবিধ বিষয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এ ঋণ কমাতে কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা (আইএমএফ) তহবিলের চাপ রয়েছে। খেলাপি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরেও নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। তবুও তা কমানো যাচ্ছে না।

অর্থ ঋণ আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে অনেক গ্রাহক ইচ্ছে করেই খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। এতে লাগামছাড়া হয়ে পড়ছে খেলাপি ঋণ। এটি কমাতে আদালতের সংখ্যা বাড়িয়ে দ্রুত মামলা নিস্পত্তির দাবি জানাচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থ ঋণ আদালতে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ২২ হাজার। এসব মামলায় আটকে রয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত অর্থ ঋণ আদালতে দেড় লাখ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যাতে অর্থের পরিমাণ ৮২ হাজার কোটি টাকা।

তবে এর মধ্যে প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থ ঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭২ হাজার, যার বিপরীতে আটকা অর্থের পরিমাণ এক লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।