৬ ব্যাংকের এলসি খোলায় শর্ত প্রত্যাহার

শরিয়াভিত্তিক ৬ ব্যাংকের এলসি খোলায় শতভাগ মার্জিনের বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকগুলো হলো—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। এসব ব‌্যাংক গত সরকা‌রের আম‌লে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ও তার গ্রুপের দখলে ছিল।

এতদিন এসব ব‌্যাংক এল‌সি খুল‌তে গে‌লে শতভাগ অর্থাৎ ১০০ টাকার এল‌সির বিপরী‌তে ১০০ টাকা মা‌র্জিন রাখ‌তে হ‌তো। এখন সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ব‌্যাংক-গ্রাহকের সম্প‌র্কের ভিত্তি‌তে মা‌র্জিন নির্ধারণ কর‌তে পার‌বে।

বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই ছয়টি ব্যাংক শেখ হাসিনা সরকারের বি‌শেষ সংস্থার সহায়তায় নিয়মবহির্ভূতভা‌বে এস আলম গ্রু‌প দখল ক‌রে‌ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে এস আলম গ্রুপের দখলমুক্ত করেছে। পরে এই ছয় ব্যাংকের ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ওই সময়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কৃষি, চলতি মূলধন, সিএমএসএমই, প্রণোদনা প্যাকেজ এবং নিজ ব্যাংকে রক্ষিত এফডিআরের বিপরীতে এসওডি ও শতভাগ নগদ মার্জিনের বিপরীতে বিনিয়োগপত্র ও অন্যান্য পরোক্ষ বিনিয়োগ সুবিধা ছাড়া অন্য কোনো বিনিয়োগ করা যাবে না। এসব খাতেও ৫ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ বা সীমাতিরিক্ত বকেয়া স্থিতির নগদ আদায় ছাড়া বিদ্যমান বিনিয়োগ সুবিধা নবায়ন করা যাবে না। অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো বিনিয়োগ অধিগ্রহণ করা যাবে না। ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতা থেকে আদায়ের তথ্য মাসিক ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।




আমদানি দায় পরিশোধে বিলম্বকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

আমদানি ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধে বিলম্ব করছে দেশের কিছু ব্যাংক। এতে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানি দায় পরিশোধে বিলম্বকারীদের জন্য কঠোর অবস্থানে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তারই পদক্ষেপ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, আগামী ৭ দিনের মধ্যে ব্যাংকগুলোর সব ওভারভিউ (মেয়াদোত্তীর্ণ এলসির দায়) পরিশোধ করতে হবে। এলসির দায় নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার কারণ জানাতে হবে। পাশাপাশি এলসির দায় বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নিয়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বরাবর চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা জানান, কোভিডকালীন এলসি দায় পরিশোধে সুবিধা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন মহামারি নেই তবুও কিছু ব্যাংক দায় পরিশোধে বিলম্ব করছে। এতে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে আমদানি এলসির খরচ। তাই আগামী ৭ দিনের মধ্যে সব আমদানি দায় পরিশোধ করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত ডলার না থাকলে প্রয়োজনে ডলার কিনে দায় পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময় ব্যাংক দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার যথাযথ কারণ জানাতে হবে। পাশাপাশি কোনো ঋণপত্র খোলার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। এলসির দায় পরিশোধে ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে।

মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) এলসি দায় পরিশোধে বিলম্বকারীদের জন্য বেশকিছু নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আমদানি ঋণপত্র বা এলসির দায় পরিশোধে বিলম্বের কারণে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে আমদানি ব্যয়সহ ও বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এখন থেকে এলসি খোলার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ এলসি গ্রহণযোগ্য হবে না। সময়মতো পেমেন্ট নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হলে লেনদেনের জন্য দায়ী কর্মকর্তাকে জবাবদিহিতার পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




আগস্টে বেড়েছে এলসি খোলার হার

চলমান ডলার সংকটের কারণে নিষ্পত্তি কমে গেলেও গত পাঁচ মাসের মধ্যে আগস্টে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার হার ছিল সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি এলসি খোলা হয়েছে। গত মার্চ মাস থেকে এলসি খোলার পরিমাণ কমছে। মার্চে ৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়, জুনে খোলা হয় ৪ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের এলসি; যা তিন বছরের সর্বনিম্ন। কিন্তু নতুন অর্থবছরে আমদানি বাড়তে শুরু করেছে।
তবে প্রান্তিক হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে আগস্টে এলসি খোলার হার ১৪ শতাংশ কমেছে। ২০২২ সালের আগস্টে ৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল।

কেন বছরের পর বছর এলসি খোলার হার কমেছে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে ৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের আমদানি এলসি পর্যবেক্ষণ করছে। এই নজরদারির কারণে ওভার ইনভয়েসিং কমেছে, যাতে সামগ্রিকভাবে এলসি খোলা হয়েছে কম। ইনকামিং ডলারের প্রবাহ বাড়াতে ডলারের জন্য একটি বাজারভিত্তিক বিনিময়হারের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে তিনি পরামর্শ দেন, বাজারভিত্তিক হার প্রাথমিকভাবে ১২০-১৩০ টাকা হতে পারে এবং শেষমেশ এটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাবে। তিনি আরও বলেন, এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তি দুটি বিষয়কেই প্রভাবিত করছে ডলারের নন-মার্কেট রেট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আগের তুলনায় আমরা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি। আমরা এক্ষেত্রে সতর্ক এবং কেবল প্রয়োজন হলেই এলসি খুলি।’ এর একটি কারণ হিসেবে তিনি এলসি খোলার সময় পেমেন্টের শিডিউল নির্ধারণের নিয়মকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ডলার ফ্লো অতটা বেশি নয়। সামগ্রিকভাবেই এলসি খোলার পরিমাণ কমছে।’

এদিকে আমদানির জন্য এলসি নিষ্পত্তিও প্রান্তিক হিসাবে আগস্টে ৩৫ শতাংশের বেশি কমেছে। গত বছরের আগস্টে ৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার এলসি পেমেন্ট করা হয়, এ বছরের একই মাসে তা ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। জুলাইতে এলসি পেমেন্টের পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলার।

এদিকে ডলার আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স সংগ্রহ আগস্টে ২১ শতাংশ কমে গেছে। এতে ব্যালান্স অব পেমেন্টে বেশ বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রিজার্ভ থেকে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। চলমান ডলার সংকট নিরসনে এসব পদক্ষেপ কার্যতই যথেষ্ট নয়।




জুলাইয়ে এলসি খোলা কমেছে

দেশের মধ্যে শুরু হওয়া ডলার সংকট এখনো কাটেনি। সহসা সংকট দূর হওয়ার লক্ষণও তৈরি হয়নি। অন্যদিকে ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে কড়াকড়ি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির লাগাম টেনে ধরা হয়। আর এতেই কমে যায় এলসি খোলা। গত অর্থবছরের মতো ঋণপত্র বা এলসি খোলা কমেছে চলতি অর্থবছরের শুরুর মাসেও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, নতুন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ৪৩৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার বা ৪.৩৭ বিলিয়ন ডলারের খোলা হয়েছে। যা গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ের (জুলাই) চেয়ে ৩১ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। আর এলসি নিস্পত্তি কমেছে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে ৭৪৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা ৭.৪৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র বা এলসি নিস্পত্তি হয়েছে। যা গত অর্থবছরের একই মাসে (জুলাই) ৫৯৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৫.৯৮ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল।

২০২২-২৩ অর্থবছরের পুরো সময়ে (জুলাই-জুন) বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ৭ হাজার ২১৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বা ৭২.২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র বা এলসি খুলেছিলেন বাংলাদেশিরা। এটি গত ২০২১-২২ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ কম।

ডলার বিক্রি আর আমদানির দায় মেটানোর কারণে কমতে থাকে দেশের রিজার্ভ। গতকাল বুধবার (২৩ আগস্ট) পর্যন্ত আইএমএফ’র হিসাব মতে দেশের খরচ করার মতো রিজার্ভ রয়েছে ২৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৩১৬ কোটি ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব মতে রিজার্ভ রয়েছে ২৯ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৯৩২ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল রিজার্ভ। পরের বছর ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৩৯ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ওই রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

রিজার্ভ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিক্রি করা হয় ১১৪ কোটি ৭০ ডলার বা ১১৪৭ মিলিয়ন ডলার। আর অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টের প্রথম ২৩ দিনে বিক্রি করা হয় ৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর আগে সদ্য বিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি হয়েছিল।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক নিট মুনাফা ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর মধ্যে সরকারকে ঋণ দিয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা লাভ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ডলার বিক্রি করে আয় মুনাফা করেছে ৬ হাজার কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণ দিয়ে আরও ২ হাজার কোটি টাকা আয় করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলে সদ্য বিদায়ী অর্থবছর ১৫ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মধ্যে খরচ করেছে ৪ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে নিট মুনাফা করেছে ১০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা।

বিদায়ী অর্থবছর সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা রেকর্ড ঋণ নিয়েছে। যার পুরো অংশই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া। এর আগের অর্থবছরে ৯৭ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকার ঋণ নেয় সরকার। এ দুই খাত থেকেই গত বছর বেশি আয় করে বাংলাদেশ ব্যাংক।