‘অরেঞ্জ বন্ড’ চালু করছে সরকার

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পথ সহজ করা এবং লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ‘অরেঞ্জ বন্ড’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার।

বিশ্বের অনেক দেশে প্রচলিত হলেও অরেঞ্জ বন্ডের মতো অর্থায়ন বাংলাদেশে এবারই প্রথম। এই নতুন ধরনের উদ্যোগ ১ বিলিয়ন পর্যন্ত টেকসই বন্ড ইস্যু করে লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেছেন, এই অরেঞ্জ বন্ড টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পথ সহজ করবে। আমাদের সফলতা ভবিষ্যতে অন্যদেরও একসাথে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) হোটেল সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশে অরেঞ্জ বন্ড প্রবর্তনের বিষয়ে ‘রিবিল্ডিং এন ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ উইথ অরেঞ্জ বন্ড’ শিরোনামে পরামর্শ সভায় এ কথা জানানো হয়।

সভায় অংশ নেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (আইআইএক্স) কর্মকর্তা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ২.০ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে অরেঞ্জ বন্ডও একটি স্থিতিস্থাপক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। গার্মেন্ট, সবুজ অবকাঠামো এবং কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ১ বিলিয়ন বিনিয়োগ করে অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছি। এটা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পথ সহজ করবে। আমাদের সফলতা ভবিষ্যতে অন্যদেরও একসাথে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, আমরা যখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কথা বলি, এখনও পর্যন্ত আমরা মূলত প্রশমনের দিকে বেশি নজর দিই। কিন্তু আমাদের এই সমস্যা মোকাবিলায় অভিযোজনের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহ্‌রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী নীতিমালা পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আজকের এই সভা অরেঞ্জ বন্ডের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উপযোগী করে তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগকে সফল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার করতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে, প্রশমন এবং অভিযোজন এই উভয় বিষয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা অব্যাহত রাখতে আমাদের একাধিক উৎস থেকে জলবায়ু তহবিল সংগ্রহ করতে হবে যার মধ্যে ক্লাইমেট ফাইন্যান্সে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা এবং ক্লাইমেট রিস্ক ইনস্যুরেন্স, ইসলামী ফাইন্যান্স, থিম্যাটিক বন্ড, ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স এবং কার্বন ট্রেডিংয়ের মতোবিষয় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, যা শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নয়, কর্মসংস্থান তৈরিতেও সাহায্য করবে।

সিডার হেড অফ ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এবং ডেপুটি হেড অফ মিশনের মারিয়া স্ট্রিডসম্যান জলবায়ু এবং ‘জেন্ডার: ইন্টারসেকশন এবং ইন্টারভেনশনস’ বিষয়ে বক্তৃতা করেন এবং লামিয়া মোর্শেদ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, এই উদ্যোগের বৈশ্বিক তাৎপর্য তুলে ধরেন।

আই আই এক্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ডুরীন শাহনাজ এই উদ্যোগের কৌশলগত জায়গার ওপরেও আলোচনা করেন। তিনি মনে করেন অরেঞ্জ বন্ড শুধুমাত্র একটা অর্থনৈতিক সমাধান না বরং এই অঞ্চলে এটি লিঙ্গ সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকান্ড, জলবায়ু পরিবর্তনের কাজের জন্যো একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য অরেঞ্জ বন্ডের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন সরকার, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সদস্য এবং বেসরকারি খাতের প্রধান প্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন এই উদ্যোগ বাংলাদেশে লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে কাজ করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতেও সাহায্য করবে।

এমএএস/এমআরএম




নারীদের জন্য অরেঞ্জ বন্ড নিয়ে বিএসইসির গোলটেবিল বৈঠক

দেশের নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আনতে যাচ্ছে ‘অরেঞ্জ বন্ড’ নামক এক বিশেষায়িত বন্ড। নারীদের জন্য, নারীদের মাধ্যমে, নারীদের এগিয়ে যাওয়ার লক্ষেই এই বন্ড তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।

মঙ্গলবার (২১ নভেম্বর) অরেঞ্জ বন্ড নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএসইসি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসইসির কমিশনার ড. রুমানা ইসলাম। অরেঞ্জ বন্ড এর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন অংশীদার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের নিয়ে উক্ত গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষত নারীদের জন্য তৈরি অরেঞ্জ বন্ড সম্পর্কে আয়োজিত উক্ত বৈঠকে দেশের নারী উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএসইসির কমিশনার ড. রুমানা ইসলাম। তিনি বৈঠকে আগত অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ দেন এবং তাদের মূল্যবান মতামত জানানোর অনুরোধ করেন। দেশের সর্বত্র নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে লিঙ্গ সমতা আনয়নে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আর সেক্ষেত্রে অরেঞ্জ বন্ড বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি জানান।

বিএসইসির কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ ‘অরেঞ্জ বন্ড’ এর ওপর তথ্যবহুল প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অরেঞ্জ বন্ড নিয়ে বিস্তারিত ধারণা তুলে ধরেন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ‘অরেঞ্জ বন্ড’ এর ধরনগুলো, এর ইস্যুয়ার ও ইস্যু সংক্রান্ত বিষয়গুলো, ফান্ডের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে তুলে ধরে কিভাবে দেশে ‘অরেঞ্জ বন্ড’ নিয়ে আসা যায় এবং কিভাবে তা কাজে লাগানো যেতে পারে তা ব্যাখ্যা করেন। ‘অরেঞ্জ বন্ড’ এর মাধ্যমে অর্থায়ন থেকে যেন নারীরা সহজেই সুবিধা পেতে পারে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখার কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশে টেকসই ‍উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সহায়ক ইকোসিস্টেম সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় গাইডলাইন তৈরির জন্য বিএসইসি ইউএনডিপির সাথে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এছাড়াও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন ও ইউএনডিপি বাংলাদেশে সাসটেইনেবিলিটি বন্ড গাইডলাইন তৈরি করছে বলে জানান তিনি। যৌথভাবে তিনি উপস্থিত নারী উদ্যোক্তাদের আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান এবং বিএসইসি এক্ষেত্রে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানান। তিনি বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের অরেঞ্জ বন্ড বিষয়ক নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন।

বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এর অপারেশর অফিসার, ইএসজি এডভাইজার-সাউথ এশিয়া, ইনভারমেন্টাল, সোশ্যাল অ্যান্ড গভর্নেন্স (ইএসজি) মিস লোপা রহমান উক্ত বৈঠকে সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অরেঞ্জ বন্ডসহ টেকসই উন্নয়ন সম্পৃক্ত বন্ড, সোশাল ও জেন্ডার সম্পৃক্ত বন্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি এক্ষেত্রে বিদ্যমান সুবিধা-অসুবিধা এবং সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

উক্ত বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে ইকমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও এফবিসিআই এর ভাইস প্রেসিডেন্ট শমী কায়সার, চালডাল এর চিফ অব স্টাফ ও গো গো বাংলা লজিসটিকস এর পরিচালক ইশরাত জাহান নাবিলা, টেক সলিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজনিন নাহার, এফবিসিআই এর পরিচালক হাসিনা নেওয়াজ, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এরএডভাইজার ফর স্ট্রাটেজি অ্যান্ড বিসনেস ডেভেলপমেন্ট রাশেদ মাকসুদ, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও বিজনেস ইনিসিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, সিএসই’র ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম ফারুক, আইডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফরিদ আহমেদ, ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) এর চিফ অব অপারেশন মো. মনোয়ার হোসেন কথা বলেন।

বক্তারা ‘অরেঞ্জ বন্ড’ এর নানা বিষয়ে আলোচনা করেন এবং মতামত জানান। এছাড়া উক্ত বৈঠকে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান ড. সুবর্ণ বড়ুয়া এবং বিএসইসির নির্বাহী পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

গোলটেবিল বৈঠকে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), সোশাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন (এসএমই ফাউন্ডেশন) সহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বৈঠকে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা দেশের পুজিবাজার এবং বন্ড বাজারের বিষয়ে একসাথে কাজ করছেন বলে জানান এবং বিশেষভাবে ‘অরেঞ্জ বন্ড’ এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগের কথা জানান।