চট্টগ্রামে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের জন্য হচ্ছে নাইট মার্কেট
চট্টগ্রাম নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা আইন প্রয়োগ করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিরসনে নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ডা. শাহাদাত বলেন, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকা ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নাইট মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আগ্রাবাদ ও চকবাজারে এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেওয়ার তিনি এ গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মেয়র বলেন, নগরীতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে অনেক সময় জীবিকার তাগিদে ফুটপাত বা সড়কের পাশে ব্যবসা করা মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের উচ্ছেদ করা হলেও পুনর্বাসন বা বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে একই সমস্যা আবারও তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম এখন একটি কসমোপলিটন নগরী। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবিকার সন্ধানে এখানে আসছেন। তাই নগর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়তে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। নগরীর বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে ওই স্থানগুলো স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখতে হবে। তা না হলে কিছুদিন পর আবারও দখল ও বিশৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের পেছনে নৈতিক অবক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে তরুণ ও কিশোরদের যথাযথভাবে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়নি। এ সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়; ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এর প্রতিকার করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. শাহাদাত বলেন, স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু ওপরের স্তরে পরিবর্তন আনলেই হবে না, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও একই ধরনের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
নগরীর আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে উন্নত ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাও স্থাপনের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, কোন এলাকায় কত রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং কোথায় সংক্রমণের হার বেশি এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে হটস্পট চিহ্নিত করা হচ্ছে। তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাগুলোকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু জ্বরের চিকিৎসা করলেই হবে না, জ্বরের প্রকৃত কারণও নির্ণয় করতে হবে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের সঠিক কারণ নির্ণয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নগর ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মেয়র বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল হেলথ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা এবং শিক্ষক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক দল, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কর্ণফুলী সেতু এলাকায় যানজট নিরসনে স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম পুনরায় চালুর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মেয়র। তার ভাষ্য, অতীতে স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে দায়িত্ব পালনকালে যানজট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা গেলে যানজট ব্যবস্থাপনায় সুফল পাওয়া যেতে পারে।
কর্ণফুলী সেতুর টোল আদায় নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, টোল আদায়ের কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়ে যানজট বাড়ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নগরীর কুলগাঁও এলাকায় বড় বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে কুলগাঁও এলাকায় একটি বড় বাস টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি উদ্বোধন করা হবে।
সবশেষে মেয়র বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিক সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।