পরিবেশ রক্ষায় তরুণ-উদ্যোক্তাদের সহায়তা করবে সরকার : পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী

 

পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসা তরুণ ও উদ্যোক্তাদের সরকার সহায়তা করবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, কোনো উদ্যোগের সফলতার জন্য শুধু পরিকল্পনা, তথ্য বা উপস্থাপনা যথেষ্ট নয়; এর বাস্তবায়নে কাজের প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, কঠোর পরিশ্রম ও নিবেদন থাকতে হবে। তরুণদের নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। শুধু মুখে কোনো উদ্যোগের কথা বললে হবে না, বাস্তবে সেটি করে দেখাতে হবে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে ‘ফ্রম ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি টু ইনোভেশন লিডারশিপ : বাংলাদেশ রেজিলিয়েন্স অপরচুনিটি’ বা ‘জলবায়ু ঝুঁকি থেকে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব : বাংলাদেশের সহনশীলতার সুযোগ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, কমিটমেন্ট থাকলে প্রোগ্রেস করা সম্ভব। সাফল্যের একমাত্র গোপন বিষয় হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম। আপনার উদ্ভাবন, আপনার ব্যবসা কিংবা আপনার আকাঙ্ক্ষা- সবকিছুর জন্যই কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির কারণে বর্তমানে অনেক কিছু সহজ হয়ে এসেছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি পরিশ্রমও করতে হবে৷ কোনো কাজকে সফল করতে হলে সেটির প্রতি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট খাতে ভালো করছেন বলেই অন্য একজন সেখানে গেলেই ভালো করবেন- বিষয়টি এমন নয়। প্রত্যেকের নিজস্ব দক্ষতা ও সক্ষমতার জায়গা রয়েছে। তাই অন্যের সাফল্য দেখে একই জায়গায় গিয়ে সফল হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। নিজের সক্ষমতার জায়গাটি চিহ্নিত করে সেখানে কাজ করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে সরকারের আন্তরিকতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া কিংবা কোনো প্রকল্প বিবেচনার ক্ষেত্রে শুধু একটি বিষয় দেখা হচ্ছে না। একটি উদ্যোগে কতটুকু পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং কতটুকু ক্ষতি কমানো সম্ভব হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো উদ্যোগে যদি ১০০ ভাগ ক্ষতির সম্ভাবনার মধ্যে কেউ ৮০ ভাগ ক্ষতি কমিয়ে ২০ ভাগ ক্ষতি রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে এমন উদ্যোগকে সুযোগ দেওয়া উচিত। কারণ এর মাধ্যমে পরিবেশের বড় ধরনের সাশ্রয় হচ্ছে।

শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ নিয়ে ব্যক্তিগত আয় বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, পরিবেশ রক্ষার নামে কারো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি বা ধান্দাবাজির সুযোগ নেই।

সরকার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন জব জেনারেশন বা কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টি সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। কোনো উদ্যোগের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সম্ভাবনা থাকলে সরকার সেখানে সহায়তা দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে।

সম্প্রতি ইটভাটা ও দূষণসংক্রান্ত একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে দূষণ কমানোর জন্য ব্লককে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্লকের ক্ষেত্রে ভ্যাট, কর এবং সরকারি ক্রয়ের মূল্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বাজেটে সরকারের বিনিয়োগের অগ্রাধিকারের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় বিবেচনা করা হবে। এগুলো হলো- অর্থের যথাযথ ব্যবহার, মুনাফা বা লাভজনকতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিবেশ। এই চারটি বিষয় ঠিক থাকলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও সুযোগ তৈরি করা হবে।

তরুণদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘লিড বাই এক্সাম্পল’ অর্থাৎ নিজের কাজের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। একজন তরুণকে দেখাতে হবে, তিনি কী করতে পারেন এবং কী করেছেন। একই সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। শুধু পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা দিয়ে কাউকে নিজের সক্ষমতার বিষয়ে বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন) ড. মো. সাইমুম পারভেজ বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশের অবদান খুবই কম। এটিই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে তিনি একটি ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কমিউনিটিভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ মোকাবিলা, ভাসমান ও উঁচু জমিতে কৃষি, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাষ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে।

তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এর আওতায় ২৮ বছরের কম বয়সি উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ এবং বাকি ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ প্রকল্প ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এছাড়া স্থানীয় পণ্যকে সামনে এনে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার লক্ষ্যে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই বিশেষ সহকারী।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় পণ্যকে কেন্দ্র করে এমন উদ্যোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় পণ্য ও পণ্যভিত্তিক উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে।

জলবায়ু অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বে যেসব জলবায়ু তহবিল রয়েছে, সেগুলো থেকে বাংলাদেশে যতটা সম্ভব অর্থায়ন আনার চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় জলবায়ু তহবিল অর্থায়ন কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থায়ন, সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা, উদ্ভাবন, তরুণদের নেতৃত্ব, সবুজ প্রযুক্তি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।