এআই প্রযুক্তিতে বাড়ছে বীমা প্রতারণার ঝুঁকি
বীমা খাতে প্রতারণার নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে ডিপফেক প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও ও নথি এতটাই বাস্তবসম্মত হতে পারে যে আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে গ্রাহকের দেওয়া তথ্য ও ক্ষতিপূরণ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
ডিপফেক এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বাস্তবের মতো দেখতে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও বা তথ্য তৈরি করা যায়। একইভাবে আসল ছবি, ভিডিও কিংবা নথিতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বীমা প্রতারণার নতুন পথ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বীমা খাতে ডিপফেকের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা দিতে পারে ক্ষতিপূরণ দাবির ক্ষেত্রে। প্রতারকরা দুর্ঘটনার ভুয়া ছবি, সাজানো ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ, পরিবর্তিত পরিচয়পত্র, নকল চিকিৎসা প্রতিবেদন কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ব্যবহার করে বীমার অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে গাড়ির বীমায় এ ধরনের প্রতারণার আশঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সতর্কতা বাড়ছে।
বর্তমানে গ্রাহকের তথ্য বিশ্লেষণ, পলিসি অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ দাবি যাচাই, গ্রাহকসেবা ও প্রতারণা শনাক্তকরণসহ বীমা খাতের বিভিন্ন কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। ইউরোপীয় বীমা ও পেনশন কর্তৃপক্ষের (EIOPA) ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপের ৬৫ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আরও ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আগামী তিন বছরের মধ্যে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিচালন ব্যয় কমানো এবং গ্রাহকদের দ্রুত ও উন্নত সেবা দিতে এআইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। তবে প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এআই সব সময় কোনো তথ্য, ছবি বা নথি আসল নাকি কৃত্রিম—তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পারে না।
কারণ এআই সাধারণত পূর্ববর্তী তথ্য ও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোনো ছবি সত্যিই দুর্ঘটনার সময় তোলা হয়েছে কি না, কোনো নথি আসল কি না কিংবা কোনো ভিডিওতে পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন।
এ কারণে অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এআইয়ের পাশাপাশি মানবিক যাচাই ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে। সাধারণ ক্ষতিপূরণ দাবির ক্ষেত্রে এআই দ্রুত প্রাথমিক যাচাই করতে পারলেও বড় অঙ্কের দাবি, সন্দেহজনক নথি কিংবা জটিল মামলার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চূড়ান্ত যাচাইয়ের গুরুত্ব এখনো রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বীমা প্রতারণার কারণে প্রতিবছর বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বীমা প্রতারণা প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা কোয়ালিশন এগেইনস্ট ইন্স্যুরেন্স ফ্রডের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বীমা প্রতারণার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও নথির অপব্যবহার যুক্ত হওয়ায় প্রতারণার ধরন আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিপফেক ব্যবহার করে বীমা প্রতারণার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ এ ধরনের অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করে ভুয়া দুর্ঘটনার ছবি, পরিবর্তিত নথি ও কৃত্রিম পরিচয় তৈরির মাধ্যমে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ার বিষয়টি উঠে আসছে।
ডিপফেক শনাক্ত করতে তথ্যের উৎস যাচাই, পরিবর্তিত ছবি ও নথি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং এআইভিত্তিক বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ছবি বা ভিডিওর উৎস, সেটিতে পরবর্তীতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না এবং উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে মূল তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়।
ডিপফেকের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এআই ব্যবহারে নতুন নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইনে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবস্থার জন্য বাড়তি নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও জাপানও এআই ব্যবহারে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও গ্রাহক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বীমা খাতেও ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অনলাইন পলিসি ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল গ্রাহকসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দাবি যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হলেও এআই ব্যবহার করে ডিপফেক শনাক্ত করার সক্ষমতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
দেশের অধিকাংশ বীমা প্রতিষ্ঠানে উন্নত এআইভিত্তিক তথ্য যাচাই ব্যবস্থা এখনো ব্যাপকভাবে চালু হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বীমা খাত আরও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিপফেকভিত্তিক প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত তথ্য যাচাই প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানবিক যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রমাণের উৎস ও সত্যতা যাচাইয়ের ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামী দিনের বীমা খাতে শুধু দ্রুত ক্ষতিপূরণ দাবি নিষ্পত্তি করাই যথেষ্ট হবে না; বরং আসল ও কৃত্রিম তথ্যের পার্থক্য নির্ভুলভাবে শনাক্ত করাই হয়ে উঠবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না গেলে ডিপফেক বীমা খাতে নতুন ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।