অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আইডিআরএর নতুন চেয়ারম্যান

বছরের পর বছর গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম নেওয়া হলেও মেয়াদ শেষে কিংবা দুর্ঘটনা-দুর্যোগে বীমা দাবি পরিশোধে গড়িমসি, নানা অজুহাত ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে দেশের বিভিন্ন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। কোথাও আর্থিক অনিয়ম, কোথাও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, আবার কোথাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকির অভাব—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনাস্থা। এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বীমা খাতে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিতিন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিতিন বলেছেন, বীমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের দীর্ঘদিনের সংশয় দূর করতে বীমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, দাবি পরিশোধের সামর্থ্য এবং ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (IDRA) সদস্য (নন-লাইফ) মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকের সঙ্গে বীমা খাতের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন দৈনিক মাতৃভূমির খবরের সহ-সম্পাদক তুহিন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সাংবাদিকদের একটি দল।
আলোচনায় বীমা খাতে বিদ্যমান সংকট, গ্রাহকসেবা, দাবি পরিশোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসহ খাতটির উন্নয়ন ও সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা খাতে গ্রাহকের আস্থা ফেরানো এখন আইডিআরএর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাবি পরিশোধে বিলম্ব, গ্রাহক হয়রানি, অতিরিক্ত ব্যয়, অনিয়ম এবং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় এই খাতের সম্প্রসারণও বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আইডিআরএর নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও সম্পদের প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনা, গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই এবং ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম থাকলে তা চিহ্নিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে হলে শুধু কাগজে-কলমে নির্দেশনা নয়, নিয়মিত ও কার্যকর তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।

বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেও প্রয়োজনের সময় বীমা দাবি আদায়ে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে একদিকে যেমন গ্রাহক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর আস্থাও নষ্ট হয়।

নতুন চেয়ারম্যানের বক্তব্যে এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর মতে, গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো বীমা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। সময়মতো ও ন্যায্যভাবে দাবি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম ও বিধিমালা লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বীমা খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, অনিয়মিত কমিশন প্রদান, বিনিয়োগে অসংগতি, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং গ্রাহকের দাবি নিষ্পত্তিতে গড়িমসির মতো অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সংকটে থাকা বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও দায়-দায়িত্ব পর্যালোচনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই পড়ে। তাই বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহকের দাবি পরিশোধের সামর্থ্য নিশ্চিত করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা খাতে আস্থা ফেরাতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, কমিশন প্রদান এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। অনিয়ম ধরা পড়লে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে।

তবে বীমা খাতে দীর্ঘদিনের অনাস্থা একদিনে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সংস্কার, নিয়মিত তদারকি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং গ্রাহকের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি। আইডিআরএর নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন বীমা খাতসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের প্রত্যাশা, কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির মাধ্যমে বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং দীর্ঘদিনের অনাস্থা কাটিয়ে আবারও গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে দেশের বীমা খাত।