হয়রানিমুক্তভাবে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে উগ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে  : ডিএসসিসি প্রশাসক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করে টাকা জমা দিলে একই দিনে লাইসেন্স দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য একবারে পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা চালুর ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ করিম এবং ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এ সময় ঢাকা চেম্বারের পরিচালক ও সহযোগী, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে কোনো ধরনের হয়রানি সহ্য করা হবে না। দিনের লাইসেন্স দিনে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী টাকা জমা দেওয়ার পর লাইসেন্স না পেলে বিষয়টি তাঁকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘দিনেরটা দিনে’ লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা কোনো সেকশনের কারণে যদি এতে ব্যর্থতা ঘটে, তাহলে তাঁর কাছে অভিযোগ করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসক বলেন, কোনো কোনো ব্যবসায়ী মাসের পর মাস ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ার অভিযোগ করছেন। এমন ঘটনা হয়ে থাকলে কার কাছে টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, কবে দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য লিখিতভাবে দিলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

ডিএসসিসি’র ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করার ওপরও গুরুত্বারোপ করে আব্দুস সালাম বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সংখ্যা আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স জাল হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতে হাতে জাল লাইসেন্স তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, অথচ সিটি করপোরেশন তা জানছে না এবং রাজস্বও পাচ্ছে না। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে লাইসেন্স ব্যবস্থাকে আরও অটোমেশন ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগের কথাও জানান প্রশাসক। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যেন ঘরে বসেই কর ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ করতে পারেন এবং ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হবে। রাজস্ব পরিশোধের জন্য ব্যাংকের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে; প্রয়োজনে আরও ব্যাংক যুক্ত করা হবে।

একবারে পাঁচ বছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের দাবির বিষয়ে আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীদের এমন সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া ট্রেড লাইসেন্স নিয়েও আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ, ১০ বা ২০ বছর ধরে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয়নি, তাদের সমস্যা সমাধানে ঢাকা চেম্বারের মাধ্যমে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদাভাবে বসার কথা জানান প্রশাসক।

তিনি বলেন, মার্কেটভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে টিম করে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসে বকেয়া ও নবায়ন-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। ব্যবসায়ী সমাজ সহযোগিতা করলে এ ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা ছাড়া ঢাকাকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবসাবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রেখে ব্যবসায়ীদের সেখানে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা একসময় মতিঝিলকে ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। পরে ব্যবসা গুলশান, বনানী ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ও ব্যবসার পরিবেশ ধরে রাখতে ব্যবসায়ী সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।

যানজট ও হকার সমস্যা নিয়েও কথা বলেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তার মতে, যানজটের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এতে ব্যবসায়ীসহ পুরো রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হকার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশন কাজ করছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, হকার উচ্ছেদই একমাত্র সমাধান নয়; তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। তবে একই সঙ্গে সড়ক ও ফুটপাত ব্যবহারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বলেন, নগরের উন্নয়ন ও সেবা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স, কর ও অন্যান্য সেবা আরও সহজ করা হবে।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ট্রেড লাইসেন্স ব্যবসা পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। কিন্তু নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতা, একাধিকবার অফিসে যাতায়াত এবং বিভিন্ন ধাপে সময়ক্ষেপণের কারণে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করাই যৌথ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অনলাইনভিত্তিক সেবা ব্যবহারে সক্ষম করে তোলাও প্রয়োজন।

তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার জন্য নাগরিক ও ব্যবসায়িক সেবার ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ। ডিএসসিসির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও ব্যবসাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ডিএসসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান জানান, সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স। বর্তমানে ডিএসসিসির আওতায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৮টি ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। ব্যবসার ধরন, প্রকৃতি, শ্রেণি ও সাইনবোর্ডের পরিমাণ অনুযায়ী সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ এবং আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ অনুসারে ২৯৪ ধরনের ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়।

তিনি জানান, ডিএসসিসি’র ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এসব কার্যালয়ে প্রধান কর আদায়কারী কর্মকর্তা, ডেপুটি ট্যাক্স অফিসার ও কর-লাইসেন্স সুপারভাইজাররা দায়িত্ব পালন করছেন।

খয়বর রহমান বলেন, ২০২৫ অর্থবছরে ট্রেড লাইসেন্স খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। ২০২৬ অর্থবছরেও ১৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স শুধু সিটি করপোরেশনের রাজস্বের উৎস নয়; এটি একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ব্যবসায়ীদের নিজ নিজ ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ এবং সময়মতো নবায়ন করা উচিত।

সভায় বক্তারা ব্যবসাবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা, ট্রেড লাইসেন্স সেবার ডিজিটালাইজেশন, যানজট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে সিটি করপোরেশন ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।