কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে আটক

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ চাকরিতে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ছয়টি মামলার অনুসন্ধানে এই চিত্র উঠে আসে।

দুদক জানায়, বেনজীর বিদেশেও পাচার করেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। গতকাল রোববার তিনি দুদকের মামলাতেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদক বেনজীর, তাঁর স্ত্রী জীসান মির্জা, মেয়ে ফারহিন রিশতা বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পাঁচটি মামলা করে। তাদের বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও রয়েছে।

৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীরের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আরও একটি মামলা করা হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১১ কোটি টাকা। এই মামলায় তাঁকে বিদেশে গ্রেপ্তার করিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতে আদালতে আবেদন জানিয়েছিল দুদক।

অপরাধমূলক অসদাচরণ ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণের অভিযোগে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর মামলা করে দুদক। বেনজীর আহমেদ ঢাকায় পুলিশ কমিশনার, র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় পুলিশের ডিআইজির মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদনপত্রের ‘প্রফেশন’ অংশে সরকারি চাকরিজীবী ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেছিলেন। সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জাল-জালিয়াতি ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করে বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়া মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)/ই-পাসপোর্টের (ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট) জন্য আবেদন করেছিলেন।

সম্পদের বাজারমূল্য

বেনজীর আহমেদ চাকরিতে থাকাকালে সব ধরনের স্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন মৌজামূল্যে, অর্থাৎ সরকারি মূল্যে। স্থানীয় মানুষকে ভয় দেখিয়ে জবরদস্তিমূলক অনেক জমির মালিক হয়েছেন। বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুদকের ছয় মামলায় ৮৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদরের টুঠামান্দ্রা মৌজায় ৬০০ একর জমিতে বিশাল রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক হাজার কোটি টাকা। এই রিসোর্টে ২০ একর জমিতে একটি পুকুরসহ মোট ২৮টি পুকুর রয়েছে। চারটি ডুপ্লেক্সসহ মোট ১২টি কটেজ, একটি সুইমিংপুল, শিশু পার্ক, দেশি-বিদেশি ফলের বাগান আছে। রিসোর্টটি করা হয় ২০১৬ সাল থেকে। আদালতের আদেশে এটি ক্রোক করা হয়। বর্তমানে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এই রিসোর্টটির রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে তাঁর দুটি আলিশান বাংলো।

ঢাকার গুলশানে ৪ ফ্ল্যাট

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের র‍্যাংকন টাওয়ারে বেনজীরের চারটি ফ্ল্যাট দুদকের জিম্মায় রয়েছে। চার হাজার ৫৯৫ বর্গফুট করে মোট ৯ হাজার ১৯০ বর্গফুটের ডুপ্লেক্স দুটি ফ্লোরে পাঁচটি বেডরুম আছে। একটি রুম থেকে আরেকটি রুমের দূরত্ব ২৫-৩০ বর্গফুট। ১৯ কাঠা ১২ ছটাক জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে র‍্যাংকন আইকন টাওয়ার নামের ভবনটি।

প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য চার-পাঁচ কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে বেনজীর আহমেদ প্রভাব খাটিয়ে ফ্ল্যাটগুলো ক্রয় করেছেন অর্ধকোটির কিছু বেশি টাকায়। ভবনটির ১৩ তলায় দুটি বেডরুম, একটি কিচেন রুম, একটি ডাইনিং রুম ও নিজস্ব অফিস কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ১৪ তলায় তিনটি বেডরুম, বাকি স্থান উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দামি খাট, কাঠের ওয়াল কেবিনেটে সাজানো হয়েছে কক্ষগুলো।