আইএসপিএবি সভাপতি
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খাত উপেক্ষিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম।
তিনি বলেন, এই বাজেটে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি কিছুই পায়নি। কোনো ধরনের কর অবকাশ কিংবা কর ছাড়ের সংবাদ আমরা পাইনি। আমাদের প্রত্যাশা কিংবা প্রস্তাবনার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি বাজেটে।
রোববার (১৪ জুন) ঢাকার বনানীতে আইএসপিএবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। লাইসেন্সধারী আইএসপি প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা ও সহিংসতার প্রতিবাদে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সংগঠনটি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইএসপিএবি সভাপতি বলেন, বাজেটে আমরা চেয়েছিলাম, প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের যে ৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে, সেটি যেন মওকুফ করা হয়। এটি আমাদের দাবি ছিলো। কিন্তু সেটি আমরা পাইনি। আমরা স্পষ্টভাবে চেয়েছিলাম আমাদের শিল্পকে আইটি এনাভল সার্ভিস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, সেটা দেওয়া হয়নি। আমরা আমাদের নেটওয়ার্কে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি—রাউটার, সুইচ ও অপটিক্যাল ফাইভারসহ বিভিন্ন উপকরণে কর অবকাশ চেয়েছিলাম, যে ধরনের ভ্যাট আছে তা কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেখানে কোনো ধরনের নতুন কোনো ছাড় দেয়নি। আগের মতোই উচ্চকর রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা থাকলেও দেশের ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাতের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য কর অবকাশ বা প্রণোদনা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন আইএসপিএবি সভাপতি।
তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিং বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সংযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজেটে সেই মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সরকার ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য কর সুবিধা দিয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কম মূল্যে ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা না পেলে একজন ফ্রিল্যান্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর কার্যক্রম পরিচালনা করবেন কীভাবে—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আইএসপিএবি সভাপতি বলেন, ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক সেবার পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ আবাসিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় বিদ্যমান ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের বিষয়ে বাজেটে কোনো ঘোষণা আসেনি।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি মানুষের বিপরীতে মোবাইল অপারেটরদের প্রায় ৩২ কোটি ৮০ লাখ বৈধ সিম সক্রিয় রয়েছে। ফলে মোবাইল খাত ইতোমধ্যে ব্যাপক বিস্তৃতি অর্জন করেছে। অন্যদিকে, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাত এখন পর্যন্ত মাত্র দেড় থেকে দুই কোটি মানুষকে উচ্চগতির ও উৎপাদনশীল ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আনতে পেরেছে। অর্থাৎ, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো মানসম্মত ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে ভ্যাট প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন কর সুবিধা প্রয়োজন ছিল। এতে ইন্টারনেট ব্যবহার আরও সাশ্রয়ী হতো এবং নতুন গ্রাহক সংযুক্ত করা সহজ হতো। ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ওপর উচ্চহারে কর আরোপিত থাকায় বিনিয়োগ ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
আইএসপিএবি সভাপতি আরও বলেন, ফাইবার অপটিক ক্যাবল, ওএলটি, রাউটারসহ বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম আয়করসহ বিভিন্ন কর মিলিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করভার বহন করতে হয়। ফলে নতুন অবকাঠামো স্থাপনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও করের চাপ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদনশীল ইন্টারনেট সেবার প্রসারে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা জরুরি। অন্যথায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাশ্রয়ী ও উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, দেশের অন্যতম ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডট ইন্টারনেটের করপোরেট কার্যালয়সহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং নেটওয়ার্ক দখলকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে আইএসপিএবি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৯ জুন রাতে ঢাকার মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় ডট ইন্টারনেটের প্রধান কার্যালয়সহ রাজধানীর বাড্ডা, চাঁদপুর সদর, কুমিল্লার দেবিদ্বার, গাজীপুর ও বগুড়ায় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়, বরং দেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত।