বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ চার গুণ বৃদ্ধি করবে এডিবি
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বেসরকারি খাতে তাদের বার্ষিক অর্থায়ন চার গুণ বাড়িয়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকও তাদের প্রকিউরমেন্ট বা ক্রয় নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যেখানে গুণগত মান, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার রাজধানীর চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক বিজনেস অপরচুনিটি সেমিনারে এডিবি ও বিশ্বব্যাংক তাদের এই পরিকল্পনা তুলে ধরে। এতে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, উদ্যোক্তা এবং উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে বেসরকারি খাতকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে এডিবি।
সংস্থাটির মতে, প্রচলিত সরকারি অর্থায়ন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
সরকার অনুমোদিত ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক’ পরিকল্পনায় আগামী ২০ বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক বিনিয়োগ বেসরকারি খাত থেকে আসার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়, এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
এডিবি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ, সিমেন্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল লজিস্টিক খাতে সরাসরি বিনিয়োগ করেছে। সংস্থাটি ঋণের পাশাপাশি ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি গ্যারান্টির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে সহায়তা করছে। এতে করে বড় বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝুঁকি কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একই সঙ্গে এডিবি তাদের ক্রয় নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ‘সর্বনিম্ন দর’ ভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ‘সবচেয়ে সুবিধাজনক বিড’ পদ্ধতি চালু হবে। নতুন এই ব্যবস্থায় দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু দাম নয়, বরং কাজের গুণমান, স্থায়িত্ব, উদ্ভাবন এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকও তাদের প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় একাধিক সংস্কার এনেছে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক দরপত্রে গুণগত মানের জন্য ন্যূনতম ৫০ শতাংশ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে শুধু কম দর দিয়ে কাজ পাওয়ার সুযোগ কমে আসবে।
এছাড়া বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে স্থানীয় কর্মীদের জন্য অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রম ব্যয় সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। এতে দেশীয় কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নারী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সরাসরি পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের অধীনে বর্তমানে ৩৯টি প্রকল্পে ১১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চলছে। ২০২৭ অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ২৮টি প্রকিউরমেন্ট সুযোগ আসছে। এর মধ্যে বে টার্মিনাল প্রকল্প, ভোমরা স্থলবন্দর সম্প্রসারণ, চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ এবং যমুনা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর এই নতুন কৌশল বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মানে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।