‘এসআইবিএলকে একীভূত নয়, প্রকৃত মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিন’

‘সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) মারাত্মক ক্ষতি করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর’-এমন অভিযোগ ঢাকা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের। তার মতে, প্রায় দেড় বছর ধরে অনভিজ্ঞ পর্ষদ দিয়ে এসআইবিএল পরিচালনা করা হয়। এতে গ্রাহক অনাস্থায় প্রায় অর্থশূন্য হয়ে পড়ে ব্যাংকটি। সে কারণে এসআইবিএলকে একীভূত না করে দখলের আগে যাদের হাতে ছিল সেই মূল মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে তিনি এই আহ্বান জানান। চিঠির একটি অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

সংসদ-সদস্য চিঠিতে দাবি করেন, ২০১৭ সালে শেখ হাসিনার নির্দেশে একটি সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর সহায়তায় অস্ত্রের মুখে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় সাইফুল আলম (এস আলম)। এর আগে ধারাবাহিকভাবে ভালো আর্থিক পারফরম্যান্স ছিল এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি বছর ২০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ দেওয়া হতো। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এস আলম নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি প্রকৃত মালিকদের হাতে ব্যাংক ফেরত না দিয়ে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং মাত্র একজন উদ্যোক্তা পরিচালকের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। যা ছিল ব্যাংকটিতে আর্থিক দুরবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

চিঠিতে আরও বলা হয়, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের অনেক উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারের পরিচালক হওয়ার যাবতীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদে তাদের যুক্ত করা হয়নি। তাদের যুক্ত করতে বারবার অনুরোধ করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বিষয়টি আমলে নেননি। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করলেও প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের অন্তর্ভুক্ত না করায় গ্রাহকদের আস্থা কমে যায়।

তিনি অভিযোগ করেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব না দেওয়ায় আরও অনাস্থা সৃষ্টি হয়। এতে জমানো টাকা তুলতে শুরু করেন আমানতকারীরা। ফলে গভীর সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট অর্থের জোগান দিলেও ব্যাংকটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

চিঠিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যাদেরকে পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে, তারা কেউ এর আগে কোনো ব্যাংক পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। প্রায় দেড় বছরে ধরে অনভিজ্ঞ পর্ষদ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ব্যাংকটি পরিচালনা করেছেন। এতে ব্যাংকটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংসদ-সদস্য অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটিকে অকার্যকর ঘোষণা করে ব্যাংক রেজ্যুলেশন স্কিমের আওতায় নেওয়া হয়। যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে ইতোমধ্যে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। আদালত রুল জারি করলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ তার জবাব না দিয়েই একতরফাভাবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ব্যাংকটির প্রকৃত উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে দিলে এবং নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করা হলে এসআইবিএল দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং আবারও একটি লাভজনক ব্যাংকে পরিণত হবে। এসআইবিএলকে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত না করে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্গঠনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর শরিয়াহভিত্তিক দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে এসআইবিএল কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ব্যাংকটি উদ্বোধন করেন। যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। ব্যাংকটি মূলত যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে অন্যতম হলেন-সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এম এ মান্নান; নাইজারের সাবেক অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং ওআইসির সাবেক মহাসচিব ড. হামিদ আল গাবিদ; সৌদি পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার এবং ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগের মহাসচিব ড. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ। আরও যুক্ত ছিলেন সৌদি আরবের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আহমেদ এম সালাহ জামজুম। যুক্ত ছিল সৌদি আরবের রিলিফ ফান্ড- ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ড, ইসলামিক চ্যারিটেবল সোসাইটি এবং হামদর্দ ল্যাবরেটেরিজ বাংলাদেশসহ দেশি-বিদেশি নামি দামি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান। ২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ব্যাংকটি। বর্তমানে এই ব্যাংকের ১৮১টি শাখা, ২৪০টি উপশাখা এবং ৩৭০টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত না হলে এমন সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।