পুঁজিবাজার শক্তিশালী না হলে শিল্পায়ন সম্ভব নয়: এনবিআর চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী না করে কোনো দেশ শিল্পায়নের পথে এগোতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প বিকাশের জন্য পুঁজিবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়নে।

নতুন সরকারের জন্য শেয়ারবাজারে চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে রোববার (৮ মার্চ) পুঁজিবাজার বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে শিল্প বিপ্লবের সময় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ধারণা এসেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ ছোট ছোট অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধারণা অনুযায়ী পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি। ফলে ব্যাংক থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য শিল্পকে সমর্থন দেওয়া কঠিন। অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে ইকুইটির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলে সেই অর্থ ফেরত দিতে হয় না, কোম্পানি লাভ করলে বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ পান।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় আসেন। তাই এখানে কেবল সেসব কোম্পানির তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত, যাদের দীর্ঘমেয়াদি লাভের সক্ষমতা ও সুস্পষ্ট ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও তারা প্রত্যাশিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি কাটাতে হলে তালিকাভুক্তির পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে শতভাগ সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো ধরনের ভুল তথ্য, মিথ্যা ঘোষণা বা ভ্রান্ত হিসাব দেওয়া চলবে না।

ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে অনিয়মের সুযোগ অনেক কমে যাবে।

পুঁজিবাজারে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার অতীতে বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা দিয়েছে। এমনকি ক্যাপিটাল গেইন কর কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, তাও ৫০ লাখ টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু তাতেও বাজারে স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এনবিআর চেয়ারম্যানের মতে, কেবল প্রণোদনা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বাজারে শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

পুঁজিবাজারকে ‘জুয়ার বাজার’ হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশ শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া শিল্পায়নে যেতে পারেনি।

মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, তাত্ত্বিকভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে দক্ষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর পারফরম্যান্সই সবচেয়ে খারাপ।

তিনি বলেন, আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও যারা অনিয়ম করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দায়িত্ব মাথায় রেখেই কাজ করে। তবে একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে তারা প্রস্তুত আছেন।

আগে অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি, এই অভিজ্ঞতাটিও মনে রাখতে হবে- বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান।