অনিয়মে জর্জরিত চার্টার্ড লাইফের এজিএম পণ্ড

চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি—পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের চতুর্থ প্রজন্মের এই কোম্পানি এখন নীতিমাল লঙ্ঘন আর অনিয়মে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। এর প্রেক্ষিতে আজ কোম্পানীর ১২তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিশৃঙ্খলার মুখে শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়ে গেছে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে রয়েছে একের পর এক অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব ও আইনের লঙ্ঘন। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা কোনো আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন আর বিনিয়োগকারীদের অভিযোগগুলো:

  • বার্ষিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি:
    ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরজুড়ে প্রথম তিন প্রান্তিকে আয় বাড়লেও শেষ প্রান্তিকে কৃত্রিমভাবে লোকসান দেখিয়ে শেয়ারপ্রতি ১১ পয়সা লোকসান দেখানো হয়েছে। আগের বছর একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ১৬ পয়সা।

  • লভ্যাংশ বঞ্চনার অভিযোগ:
    বিনিয়োগকারীদের দাবি, বছরের শেষ প্রান্তিকে কৃত্রিম লোকসান দেখিয়ে ২০২৪ সালের জন্য কোনো লভ্যাংশ না দেয়ার পথ তৈরি করেছে কোম্পানিটি। অথচ ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে আবার মুনাফা দেখানো হয়েছে।

  • আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন:

    • ২০২৪ সালে কোম্পানির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার আবু আহমাদ কবির নিজেকে ‘ভারপ্রাপ্ত সিইও’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা বীমা আইন অনুযায়ী আইডিআরএ’র অনুমোদন ছাড়া অবৈধ।

    • বার্ষিক প্রতিবেদনে আবার মুহাম্মদ আসিফ শামসকে সরাসরি সিইও হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে আইনের লঙ্ঘন।

    • ১১ জন উদ্যোক্তা পরিচালক থাকলেও কোম্পানিতে মাত্র ২ জন স্বতন্ত্র পরিচালক রয়েছে, যেখানে বিএসইসির গভার্ন্যান্স কোড অনুযায়ী কমপক্ষে ২০% স্বতন্ত্র পরিচালক বাধ্যতামূলক।

  • শ্রম আইনের উপেক্ষা:
    শ্রমিকদের মুনাফার অংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে (WPPF) জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও কোম্পানি তা মানেনি। এটি শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ২৩৪ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর লঙ্ঘন বলে গণ্য করা হচ্ছে।

  • লাইফ ফান্ডে অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির পতন:
    ২০২৩ সালে লাইফ ফান্ডে ২৫.৪০% প্রবৃদ্ধি থাকলেও ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮.২৪%-এ। এ ছাড়া পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে কম পরিমাণ এফডিআর (৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা) দেখানো হয়েছে, যা আইন পরিপন্থী।

  • কোম্পানির জবাব

    কোম্পানি সচিব জি এম রাশেদ স্বীকার করেন, “আগে থেকেই ভুল হয়ে আসছিল। এখন আমাদের নজরে এসেছে, ভবিষ্যতে পরিপালনের চেষ্টা করব।”
    স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে অনিয়ম নিয়েও তিনি বলেন, “এখানে আমাদের ব্যর্থতা এবং অবজ্ঞা স্বীকার করে নিচ্ছি।”

  • চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থার বড় পরীক্ষায়। কোম্পানির ভেতরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইন পরিপালনের ঘাটতি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। সঠিক তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই ধরনের অনিয়ম বীমা খাত ও পুরো পুঁজিবাজারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

    বিনিয়োগকারীরা জরুরী ভিত্তিতে বিএসইসি এবং আইডিআরএ-র দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।