‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যেতে পারে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স
একের পর এক আইন ভাঙছে দেশের সাধারণ বীমা খাতের কোম্পানি সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স। একদিকে আইন ভঙ্গ করে ধারাবাহিকভাবে যেমন স্বতন্ত্র পরিচালক পদে শহিদুল ইসলাম নিরুকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আবার সেই অবৈধ পরিচালককেই অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মনোনয়ন দিয়ে আইন লঙ্ঘনের ষোল আনা পূর্ণ করা হয়েছে। যেখানে আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেই নিরুর নিয়োগ অবৈধ, সেখানে কেন তাকে অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিটিতে সংঘটিত ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম অভ্যন্তরীণ অডিটে তুলে ধরা হলেও সেগুলোর থোরাই কেয়ার করেছেন শহিদুল ইসলাম নিরু। তিনি এসব অনিয়মের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত কোম্পানির প্রাক্তন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল খালেক মিয়াকে ছাড়পত্র দিয়ে ইন্স্যুরেন্স সেক্টরে বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করেছেন। এছাড়া, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে শহিদুল ইসলাম নিরু স্বাক্ষরিত বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ এর পৃষ্ঠা নং ৭৬ তে অনিয়ম পাওয়া যায়। স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিরুর নিয়োগ প্রাপ্তি ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও আইন পরিপন্থী।
কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদনের স্বতন্ত্র পরিচালক অধ্যায়ে উল্লেখিত তথ্যানুযায়ী, তিন জন পরিচালকের তিন বছর করে দুই মেয়াদে নিয়োগ শেষ হয় ৬ মে ২০১৯ তারিখে। যাদেরকে পরবর্তী এক টার্ম মেয়াদ শেষে নিয়োগ দেওয়া যাবে। কিন্তু কোম্পানি এখানেও সিজিসি ২০১৮ এর শর্ত ১(২)ই লঙ্ঘন করে এক টার্ম অপেক্ষমাণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে শহিদুল ইসলাম নিরুকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে সরাসরি আইন লঙ্ঘন করেছে।
কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২১, ২০২২, ২০২৩ এ দেখা যায়, তিনি ধারাবাহিকভাবে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এক্ষেত্রে আইনটি পরিপালন না করেও পরিপালনের ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স। এছাড়া ২০১৮ সালে অন্য যে দুই জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে তাদেরও মেয়াদ শেষ না হওয়ার আগেই বিতাড়িত করা হয়। এছাড়া ২০১৮ সালে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় তিন জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার আলোচ্যসূচি অনুমোদন করা হলেও এখানে তিন জনকে নিয়োগ না দিয়ে দুই জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কোম্পানির আস্থাভাজন লোকদের নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে এসব অনিয়ম করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া ধারাবাহিকভাবে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, নবায়ন করা হয়েছে যা লিস্টিং রেগুলেশন ২০১৫-এর ধারা-৩৮ অনুযায়ী ম্যাটারিয়াল চেঞ্জ ইনফরমেশন হিসেবে ডিএসই, সিএসই, বিএসইসিতে চিঠি দিয়ে জানানোর কথা থাকলেও এ বিষয়ে ইনফরমেশন বা চিঠি না দিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স।
এক্ষেত্রে লিস্টিং রেগুলেশনের শর্ত ৫৬ (কন্টাভেনশন) লঙ্ঘনের দায়ে ১৯৬৯ সালের বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড অ্যাকশন কমিশন আইন অনুযায়ী কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কমিশন। এছাড়া বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ এ কন্ডিশন নাম্বার ৩(১) (ই) পরিপালন না করেও টিক দিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটি বার্ষিক প্রতিবেদনে যেসব মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছে লিস্টিং রেগুলেশনের শর্ত ৪৫ (ফলস অ্যান্ড মিসলিডিং ইনফরমেশন) অনুযায়ী, সেগুলোর যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে। যা এখন পর্যন্ত ডিএসইর তথ্য বাতায়নে দেয়নি কোম্পানিটি। এখানেও পুনরায় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ এর তথ্যানুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে ৪ জন স্বতন্ত্র পরিচালকের জায়গায় মাত্র ৩ জন স্বতন্ত্র পরিচালক পরিচালনা পর্ষদে রাখা হয়। বিএসইসির নোটিফিকেশন অনুযায়ী এখানে ৪ জন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখানে ১ জন স্বতন্ত্র পরিচালক কম থাকায় করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড রিপোর্টে ১(২)(ধ)-এ আইন পরিপালন না করেও আইন পরিপালনের ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে বিএসইসির আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালন আইনটি সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ ১৯৬৯-এর ২ঈঈ-এর অধীন ইস্যুকৃত আইন। তাই এ আইন স্বতন্ত্র পরিচালক সংক্রান্ত বীমা আইনকে সুপারসিড করে। লিস্টেড কোম্পানি হিসেবে বিএসইসির আইন পালন না করেও টিক মার্ক দেয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে তামাশার শামিল। স্বতন্ত্র পরিচালক রেশিও ১/৫ না রাখায় বিএসইসির নির্দেশ পরিপালনে ব্যর্থতায় গত ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ সালে বিএসইসির প্রজ্ঞাপন নং-ঝঊঈ/ঈগজজঈউ/২০০৯-১৯৩/০৮ অনুযায়ী কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে ইস্যুকৃত নোটিফিকেশন নং ইঝঊঈ/ঈগগজঈউ/২০০৯-১৯৩/১/ধফসরহ/১০২ অনুযায়ী সিজিসি ২০১৮ এর প্রত্যেকটি শর্ত অবশ্যই পরিপালনীয়।
কোন কোম্পানি যদি সিজিসি পরিপালন করতে অস্বীকার করে বা পরিপালন করতে ব্যর্থ হয় বা লঙ্ঘন করে তা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯ এর প্যানাল প্রভিশন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এছাড়া সিজিসি পরিপালন না করার কারণে কমিশন ইচ্ছে করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে ডিলিস্টিং অথবা ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানির লেনদেন স্থগিত করতে পারে।একের পর এক আইন লঙ্ঘনে